উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি শুরু হচ্ছে বৃহস্পতিবার। ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় এবার অংশ নিচ্ছেন ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থী। সারা দেশের ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে একযোগে অনুষ্ঠিত হবে এই পরীক্ষা। শিক্ষা প্রশাসন বলছে, পরীক্ষা সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও নকলমুক্ত রাখতে এবার নেওয়া হয়েছে আগের চেয়ে আরও কঠোর প্রস্তুতি। বিশেষ করে প্রথমবারের মতো প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে, যা পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে।
পরীক্ষার সময়সূচি অনুযায়ী, নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের লিখিত পরীক্ষা ৮ অগাস্ট পর্যন্ত চলবে। এরপর ১৫ অগাস্ট পর্যন্ত ব্যবহারিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ভোকেশনালের তত্ত্বীয় পরীক্ষা ২৫ জুলাই, বিএমটির তত্ত্বীয় পরীক্ষা ১ অগাস্ট এবং ডিপ্লোমা ইন কমার্সের তত্ত্বীয় পরীক্ষা ২২ জুলাই শেষ হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার পরীক্ষার্থী ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন, যা গত বছরের তুলনায় ১৪ হাজার ৩১৬ জন বেশি। ৪ হাজার ৮৮৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এসব শিক্ষার্থী ১ হাজার ৬২৬টি কেন্দ্রে পরীক্ষায় অংশ নেবেন।
অন্যদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ৯২ হাজার ৯০৫ জন। গত বছরের তুলনায় এই সংখ্যা ৬ হাজার ৮০৩ জন বেশি। দেশের ২ হাজার ৭০৫টি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ৪৬১টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দেবেন।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এইচএসসি ভোকেশনাল, ডিপ্লোমা ইন কমার্স ও বিএমটি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন পরীক্ষার্থী। তবে এ ক্ষেত্রে গত বছরের তুলনায় পরীক্ষার্থী ১ হাজার ৬৪৭ জন কমেছে। এ বোর্ডের ১ হাজার ৮৪৯টি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ৬১০টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দেবেন।
এবারের পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সব শিক্ষা বোর্ডেই অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। পাশাপাশি পরীক্ষার্থীদের বসার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ৫ থেকে ৬ ফুট লম্বা বেঞ্চে দুইজন এবং ৪ ফুট লম্বা বেঞ্চে একজন পরীক্ষার্থী বসবে, যাতে পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় থাকে।
শিক্ষা বোর্ড পরীক্ষার কক্ষ ব্যবস্থাপনাতেও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। প্রতিটি কক্ষে অন্তত দুইজন কক্ষ পরিদর্শক থাকবেন। এছাড়া প্রতি ২০ জন পরীক্ষার্থীর জন্য একজন পরিদর্শক দায়িত্ব পালন করবেন, যাতে পরীক্ষা চলাকালে কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ না থাকে।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের সচিব অধ্যাপক এস এম কামাল উদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, তিন ফুট দূরত্বে আসন বিন্যাস, প্রতি ২০ জনে একজন পরিদর্শক এবং প্রতিটি কক্ষে ন্যূনতম দুইজন পরিদর্শক রাখার নির্দেশনা আগের বছরগুলোর মতো এবারও কার্যকর থাকবে। এ বিষয়ে কেন্দ্র সচিবদের আগেই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
পরীক্ষার্থীদের জন্যও রয়েছে কঠোর সময়সূচি। শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী, পরীক্ষা শুরুর কমপক্ষে ৩০ মিনিট আগে প্রত্যেক পরীক্ষার্থীকে কেন্দ্রে প্রবেশ করতে হবে। সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যেই পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে প্রবেশ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। এরপর কেউ এলে তার রোল নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য নথিভুক্ত করে কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে।
পরীক্ষা কেন্দ্রের বাইরে যাতে অপ্রয়োজনীয় ভিড় বা জটলা তৈরি না হয়, সে বিষয়েও কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরীক্ষা চলাকালে কেন্দ্রের ২০০ গজের মধ্যে সাধারণ মানুষের চলাচল নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ, যাতে পরীক্ষার পরিবেশ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত থাকে।
এবারের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো সব পরীক্ষা কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা বাধ্যতামূলক করা। কেন্দ্রগুলোকে ক্যামেরার মডেল, যন্ত্রের ধারাবাহিক নম্বর, পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা তথ্য পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে জমা দিতে বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে পরীক্ষা চলাকালে প্রতিটি কেন্দ্রের কার্যক্রম আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
শিক্ষা বোর্ড আরও জানিয়েছে, পরীক্ষা চলাকালে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অনুমোদিত পর্যবেক্ষক ছাড়া অন্য কেউ কেন্দ্রের ভেতরে অবস্থান করতে পারবেন না। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর কেন্দ্রের শৌচাগারও তল্লাশি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোথাও নকলের কোনো উপকরণ পাওয়া গেলে তা তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে ফেলতে হবে।
তবে পরীক্ষা চলার সময় শিক্ষা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকছে না। আগের বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও পরীক্ষার ফাঁকে ফাঁকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ১৩ লাখ পরীক্ষার্থীর এই জাতীয় পরীক্ষা শুধু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তাই প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কঠোর প্রশাসনিক তৎপরতা এবং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পরীক্ষা আয়োজনই এবার শিক্ষা প্রশাসনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।

