দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার অন্যতম প্রধান ভিত্তি শিক্ষা। তাই প্রতিবছরই উন্নয়ন বাজেটে এই খাতকে দেওয়া হয় উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ। কিন্তু বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পরও প্রকল্প বাস্তবায়নে শিক্ষা খাতের চিত্র হতাশাজনক। সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট তিনটি বিভাগই বাস্তবায়নের দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের সামগ্রিক হার গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যায়। আর এই ধীরগতির মধ্যেও শিক্ষা খাতের প্রকল্প বাস্তবায়ন ছিল তুলনামূলকভাবে আরও দুর্বল।
শিক্ষা খাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ। এর মধ্যে সবচেয়ে কম অর্থ ব্যয় করতে পেরেছে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ।
সংশোধিত উন্নয়ন কর্মসূচিতে এই বিভাগের অধীনে ২৩টি প্রকল্প চলমান ছিল। এসব প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৩ হাজার ১৪৭ কোটি টাকা, যা মোট উন্নয়ন কর্মসূচির ১ দশমিক ৫১ শতাংশ। কিন্তু অর্থবছর শেষে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের ৫০ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। ফলে ১ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা অব্যয়িত থেকে গেছে।
সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে বাস্তবায়নের দিক থেকে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অবস্থান ছিল সর্বশেষ, অর্থাৎ ১৫তম।
শুধু কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগই নয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের প্রকল্প বাস্তবায়নেও বড় ঘাটতি রয়েছে। এই বিভাগের অধীনে গত অর্থবছরে ৭২টি প্রকল্প চলমান ছিল। এসব প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার ১৯০ কোটি টাকা, যা মোট উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় ৩ শতাংশ।
অর্থবছর শেষে এই বিভাগের প্রকল্পগুলোতে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ১০৪ কোটি টাকা। বাস্তবায়নের হার দাঁড়িয়েছে ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ বরাদ্দের ৩৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়নি। টাকার হিসাবে অব্যয়িত রয়ে গেছে ৩ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা।
শিক্ষা খাতের তিন অংশের মধ্যে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এখানেও পুরো বরাদ্দ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। সাতটি প্রকল্পের বিপরীতে এই মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৮ হাজার ৬১ কোটি টাকা। এই অর্থ ছিল গত অর্থবছরের মোট উন্নয়ন কর্মসূচির ৩ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
অর্থবছর শেষে মন্ত্রণালয়টির প্রকল্প বাস্তবায়নের হার দাঁড়ায় ৬০ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ফলে বরাদ্দের ৩৯ শতাংশ অর্থ খরচ করা সম্ভব হয়নি। অব্যয়িত অর্থের পরিমাণ ২ হাজার ৩২৯ কোটি টাকা।
অর্থাৎ শিক্ষা খাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মিলিয়ে দেখা যায়, বরাদ্দের বড় একটি অংশ শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করা যায়নি। অথচ দেশের শিক্ষা অবকাঠামো, শিক্ষার মান, শিক্ষক উন্নয়ন এবং পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এই অর্থের প্রয়োজন রয়েছে।
কেন বাস্তবায়নে এত ধীরগতি?
শিক্ষা খাতে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের দুর্বলতা শুধু অর্থ ব্যয়ের হিসাব নয়; এর সঙ্গে প্রকল্প পরিচালনা, প্রশাসনিক সক্ষমতা, তদারকি এবং পরিকল্পনার মানও জড়িত। একটি প্রকল্পে বরাদ্দ থাকলেই তার সুফল পাওয়া যায় না। সময়মতো অর্থছাড়, দরপত্র, নির্মাণকাজ, জমি নির্বাচন, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং নিয়মিত তদারকি—সবকিছু ঠিকভাবে এগোতে হয়।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, শিক্ষা খাতে উন্নয়ন কার্যক্রমের এই ধীরগতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। তাঁর পর্যবেক্ষণে, যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে তার বড় অংশই অবকাঠামোগত কাজে যাচ্ছে। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের হার আরও কম।
এখানে অনিয়ম ও দুর্নীতির ঝুঁকিও রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে দুর্বল তদারকি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণে দুর্বলতাকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন তিনি।
বিশেষ করে উপজেলা পর্যায় এবং পিছিয়ে থাকা এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কোনো প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দের পর সময়মতো অর্থ ছাড় না হলে কাজের গতি স্বাভাবিকভাবেই কমে যায়। আবার প্রকল্পের স্থান ও ধরন নির্ধারণে বাস্তব চাহিদাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিলেও বরাদ্দের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন।
বড় বরাদ্দ মানেই বড় অর্জন নয়
উন্নয়ন বাজেটে শিক্ষা খাতে বড় অঙ্কের অর্থ রাখা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বরাদ্দ কত দেওয়া হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই অর্থ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেল।
একদিকে শিক্ষা খাতে বিদ্যালয়, কলেজ, কারিগরি প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অবকাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন, দক্ষ শিক্ষক তৈরি, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং পিছিয়ে থাকা অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ বাড়ানোর প্রয়োজনও রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রকল্প হাতে নিয়ে বছরের পর বছর অর্থ অব্যয়িত থাকলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব হলে শুধু ওই অর্থবছরের লক্ষ্যই অপূর্ণ থাকে না; প্রকল্পের ব্যয়ও পরবর্তী সময়ে বেড়ে যেতে পারে। নির্মাণসামগ্রীর দাম, শ্রম ব্যয় এবং অন্যান্য খরচ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একই প্রকল্প শেষ করতে ভবিষ্যতে আরও অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। ফলে ধীর বাস্তবায়ন একদিকে উন্নয়নের গতি কমায়, অন্যদিকে সরকারি অর্থের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
সামগ্রিক চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়
শিক্ষা খাতের দুর্বল বাস্তবায়নকে আলাদা কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। গত অর্থবছরে সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হারই ছিল গত ২২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম।
বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া ১৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের জন্য মোট বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৫৪ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গড় বাস্তবায়নের হার ছিল প্রায় ৭৯ শতাংশ।
এই তুলনায় শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর ৫০ শতাংশ, ৬৬ শতাংশ এবং ৬০ দশমিক ৮৭ শতাংশ বাস্তবায়ন হার স্পষ্টতই দুর্বল অবস্থানকে তুলে ধরে।
এখন প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক নজরদারি
শিক্ষা খাতের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বাড়াতে শুধু নতুন করে বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না। কোন প্রকল্প আগে প্রয়োজন, কোথায় প্রয়োজন এবং কোন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের রয়েছে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।
একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। অর্থ ছাড়ের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজ করা, অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমানো এবং প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। পিছিয়ে পড়া এলাকায় প্রকল্পের বাস্তব অবস্থা সরেজমিনে যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা খাতে উন্নয়নকে শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। একটি বিদ্যালয় বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন তৈরি হওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি সেখানে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করাও জরুরি। উন্নয়ন বাজেটের অর্থ সেই লক্ষ্যেই কার্যকরভাবে ব্যয় করতে হবে।
কারণ শিক্ষা খাতে অব্যয়িত অর্থ শুধু একটি বাজেটের হিসাব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ, দক্ষ জনশক্তি তৈরির সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রশ্ন। তাই শিক্ষা খাতের উন্নয়ন প্রকল্পে ধীরগতি কমিয়ে বরাদ্দের প্রতিটি টাকা নির্ধারিত সময়ে ও যথাযথ কাজে লাগানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

