দীর্ঘ বিতর্ক ও এক দফা পরিবর্তনের পর আবারও আগের ধাঁচের ইউনিফর্মে ফিরেছে বাংলাদেশ পুলিশ। নতুন সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বুধবার থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যদের গাঢ় নীল ও হালকা জলপাই রঙের শার্ট এবং খাকি রঙের প্যান্ট পরিহিত অবস্থায় দেখা গেছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব পুলিশ সদস্যকে নতুন ইউনিফর্ম সরবরাহ করা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
বুধবার রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে নবনির্মিত একটি পুলিশ ক্যাম্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ নতুন ইউনিফর্ম পরে উপস্থিত হন। এর মধ্য দিয়েই আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন পোশাকের ব্যবহার শুরু হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার নিয়াজ জানান, নতুন ইউনিফর্ম বিতরণ শুরু হয়েছে। তবে এখনো সব সদস্যের হাতে পোশাক পৌঁছায়নি। যারা নতুন পোশাক পেয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে তা পরে দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি সদস্যদের কাছেও পর্যায়ক্রমে ইউনিফর্ম পৌঁছে দেওয়া হবে।
পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে গত দুই বছরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের প্রভাব। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর পুলিশ বাহিনীতে সংস্কারের দাবি জোরালো হয়। সেই সময় পুলিশের ইউনিফর্মেও পরিবর্তন আনা হয়। আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পুলিশের শার্টের রং করা হয়েছিল লোহা-ধূসর এবং প্যান্টের রং ছিল কফি-বাদামি ধূসর। ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে সেই ইউনিফর্ম ব্যবহার শুরু হয়।
তবে নতুন সেই পোশাক নিয়ে মাঠপর্যায়ের অনেক পুলিশ সদস্যের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকে রঙের নির্বাচন এবং ইউনিফর্মের নকশা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকে।
পরবর্তীতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও ইউনিফর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়। গত ১৮ জুন পুলিশ সদর দপ্তর নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে পোশাকবিধিতে সংশোধন আনে। সেই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ীই বুধবার থেকে নতুন ইউনিফর্ম কার্যকর করা হয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালায় শুধু শার্ট ও প্যান্ট নয়, জার্সি, কার্ডিগান, পুলওভার, জ্যাকেট, নারী পুলিশ সদস্যদের পোশাক এবং মাথার আবরণের রঙেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, জেলা পুলিশ এবং আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন, বিশেষায়িত পুলিশ ব্যাটালিয়ন, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, অপরাধ তদন্ত বিভাগসহ র্যাব ছাড়া অন্যান্য ইউনিটের সদস্যদের ট্রাউজার হবে খাকি রঙের টিসি টুইল কাপড়ের। শার্ট হবে গাঢ় নীল রঙের টিসি প্লেইন ফেব্রিকের এবং সামনে চারটি পকেট ও সাতটি বোতাম থাকবে।
মহানগর পুলিশের সদস্যদের ক্ষেত্রে হালকা জলপাই রঙের শার্ট এবং খাকি রঙের প্যান্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব ও কাঠামো অনুযায়ী শার্টের রঙে কিছু পার্থক্য রাখা হয়েছে।
নারী পুলিশ সদস্যদের জন্যও নতুন পোশাকবিধিতে বিস্তারিত নির্দেশনা রয়েছে। তারা চাইলে শাড়ি পরতে পারবেন। জেলা পুলিশ ও অন্যান্য ইউনিটে গাঢ় নীল শাড়ির সঙ্গে গাঢ় নীল ব্লাউজ ব্যবহার করা যাবে। আর মহানগর পুলিশের নারী সদস্যদের জন্য গাঢ় নীল শাড়ির সঙ্গে হালকা জলপাই রঙের ব্লাউজ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নারী সদস্যরা অনুমোদিত গাঢ় নীল রঙের মাথার আবরণ ব্যবহার করতে পারবেন। ট্রাফিক বিভাগে কর্মরত নারী সদস্যদের সারা বছর পূর্ণহাতা শার্ট বা ব্লাউজ পরার সুযোগ রাখা হয়েছে। গর্ভাবস্থায় সংশ্লিষ্ট ইউনিটপ্রধানের অনুমতি নিয়ে সাধারণ পোশাক পরেও দায়িত্ব পালন করতে পারবেন তারা।
পোশাকবিধিতে মৌসুমভিত্তিক পরিবর্তনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। গ্রীষ্মকালে পুলিশ সদস্যদের অর্ধহাতা শার্ট এবং শীতকালে পূর্ণহাতা শার্ট পরার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জার্সি, কার্ডিগান, পুলওভার ও জ্যাকেটের রঙও নতুন ইউনিফর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারণ করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন ইউনিফর্ম ধাপে ধাপে সারা দেশে চালু করা হবে। সরবরাহ সম্পন্ন হওয়ার পর দেশের সব ইউনিটের সদস্যরা সংশোধিত পোশাকবিধি অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবেন। নতুন এই পরিবর্তনের মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীর ইউনিফর্মে আবারও আগের পরিচিত রঙের প্রত্যাবর্তন ঘটল।

