রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা পৌর এলাকার ময়েনপুর মহল্লার ঈদগাহ মাঠে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল প্রাচীন বটগাছ। বয়স ৫০০ বছর, নাকি তারও বেশি- তার সুনির্দিষ্ট হিসাব কারও জানা নেই।
তবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিস্তৃত ডালপালা আর মাটিতে গেঁথে যাওয়া অসংখ্য স্তম্ভমূলের কারণে আজ আর গাছটির মূল কাণ্ডও আলাদা করে চেনা যায় না। প্রায় এক বিঘা জমিজুড়ে ছায়া বিস্তার করা এই বটগাছ এখন পুরো এলাকার পরিচয় ও গর্বের প্রতীক।
কিন্তু আজ থেকে প্রায় ২১ বছর আগে গাছটির ভাগ্যে অন্য কিছুই লেখা ছিল। ২০০৫ সালে ঈদগাহ মাঠ সম্প্রসারণের কথা বলে গাছটি কেটে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আড়ালে গাছ বিক্রির মাধ্যমে আর্থিক লাভের পরিকল্পনাও ছিল একটি চক্রের।
গাছ কাটার সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ হয়ে আসার সময় প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে যান গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মফিজ উদ্দিন। তিনি ঘোষণা দেন, ‘এই গাছের মধ্যে আমারও ভাগ আছে। আমি আমার ভাগ বিক্রি করব না।’
ঈদগাহ মাঠ যেহেতু পুরো গ্রামের সম্পদ, তাই গাছটির মালিকানাও সবার- এই যুক্তিই গাছ রক্ষার আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। তাঁর আহ্বানে পাশে দাঁড়ান স্থানীয় গৌরাঙ্গপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক আবদুল লতিফ এবং কৃষক আলী আফজাল খাঁ। পরে আবদুল লতিফ বন বিভাগে বিষয়টি জানান।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান বন বিভাগের তৎকালীন কর্মকর্তা মো. ইউসুফ আলী, যিনি বর্তমানে রাজশাহী বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ডেপুটি রেঞ্জার হিসেবে কর্মরত।
তৎকালীন তানোর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু তাজ মো. জাকির হোসেনের নির্দেশে তিনি গাছটির সরকারি মূল্য নির্ধারণে সেখানে যান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গাছ কাটার পক্ষে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি বন কর্মকর্তাকে ৫০০ টাকা ঘুষ দিয়ে গাছটির মূল্য কম দেখানোর চেষ্টা করেন, যাতে পরে নামমাত্র দামে গাছটি কিনে বিপুল মুনাফা করা যায়। তবে ইউসুফ আলী সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
এ সময় ঘটনাক্রমে সেখানে উপস্থিত হন বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান। তিনিও গাছ কাটার বিরোধিতা করেন। পরে সবার মতামত বিবেচনায় ইউসুফ আলী গাছটির সরকারি মূল্য ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকার বেশি নির্ধারণ করেন।
এরপরও গাছ কাটার উদ্যোগ থামেনি। ইউসুফ আলীর বদলির পর আরও দুবার নতুন করে মূল্য নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়। তবে পরবর্তী কর্মকর্তারাও আগের নির্ধারিত মূল্যের নিচে নামেননি। শেষ পর্যন্ত উচ্চমূল্যের কারণে গাছ কাটার উদ্যোগ পরিত্যক্ত হয় এবং শতবর্ষী এই বটগাছ রক্ষা পায়।
প্রকৃতি সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে গত ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে গবেষণা সংস্থা ‘বারসিক’ গাছটি রক্ষায় ভূমিকা রাখা তিন ব্যক্তি- বর্তমানে ৭৮ বছর বয়সী মফিজ উদ্দিন, ৭৫ বছর বয়সী আলী আফজাল খাঁ এবং ৭০ বছর বয়সী আবদুল লতিফকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে।
বর্তমানে ময়েনপুরের এই বটগাছ শুধু একটি প্রাচীন বৃক্ষ নয়, এটি এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রতীক। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ গাছটি দেখতে আসেন। যে গাছটিকে একসময় কেটে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, আজ সেই গাছই বিশাল ছায়া মেলে আগলে রেখেছে পুরো ময়েনপুরকে।

