রাজধানী ঢাকার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ভাড়াবাসে থাকলেও তাদের বড় একটি অংশ প্রতিনিয়ত বাড়িওয়ালাদের একতরফা সিদ্ধান্ত ও নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়ছেন। বিনা নোটিশে ভাড়া বৃদ্ধি, রাতের নির্দিষ্ট সময়ের পর গেট বন্ধ, গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলের অস্বচ্ছ হিসাব এবং ব্যাচেলর ও একাকী নারীদের বাসা ভাড়া না দেওয়ার মতো অভিযোগ এখন নগরজীবনের নিত্য বাস্তবতা।
ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ, অনেক বাড়িওয়ালা কোনো লিখিত চুক্তি ছাড়াই হঠাৎ ভাড়া বাড়িয়ে দেন। রাজি না হলে বাসা ছেড়ে দেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা হয়। এতে চাকরিজীবী, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার, শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী নারীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন।
আইন থাকলেও বাস্তবায়ন নেই। বাংলাদেশের ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী নির্ধারিত নিয়ম ছাড়া বাড়িভাড়া বৃদ্ধি করা যায় না এবং লিখিত নোটিশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্টদের মতে, আইনের কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় অধিকাংশ ভাড়াটিয়াই তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিকাংশ ভাড়াটিয়া আইন সম্পর্কে সচেতন নন। আবার বাসা হারানোর আশঙ্কায় অনেকেই অভিযোগ করতেও সাহস পান না।
ব্যাচেলর ও একাকী নারীদের জন্য বাড়তি সংকট। বাসা খোঁজার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন ব্যাচেলর ও একাকী কর্মজীবী নারীরা। অনেক ভবনের সামনে সরাসরি ‘শুধু ফ্যামিলি’ বা ‘ব্যাচেলর নট অ্যালাউড’ লেখা সাইনবোর্ড দেখা যায়। ভুক্তভোগীরা জানান, বাসা পেলেও তুলনামূলক বেশি ভাড়া, কঠোর নিয়মকানুন এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে থাকতে হয় তাদের।
ইউটিলিটি বিলেও অস্বচ্ছতা। অনেক পুরোনো ভবনে আলাদা মিটার না থাকায় গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের বিল বাড়িওয়ালার নির্ধারিত হিসাবে পরিশোধ করতে হয়। ভাড়াটিয়াদের অভিযোগ, প্রকৃত ব্যবহার অনুযায়ী নয়, অনেক ক্ষেত্রেই ইচ্ছামতো বিল আদায় করা হয়।
বাড়িওয়ালাদেরও যুক্তি আছে। অন্যদিকে বাড়িওয়ালাদের দাবি, ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ, কর, বিদ্যুৎ, লিফট ও অন্যান্য খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি কিছু ব্যাচেলর ভাড়াটিয়ার আচরণগত সমস্যার কারণেও অনেক মালিক পরিবারকে অগ্রাধিকার দেন।
সমাধানে যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা: বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকারকর্মীদের মতে, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার জন্য পুরো একটি শ্রেণির মানুষের প্রতি বৈষম্য গ্রহণযোগ্য নয়। তারা ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষায়—
- ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর বাস্তবায়ন,
- ডিজিটাল রেন্টাল রেজিস্ট্রি চালু,
- ভাড়া বৃদ্ধির যৌক্তিক সীমা নির্ধারণ,
- দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন,
- এবং সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন।
তাদের মতে, রাজধানীর ক্রমবর্ধমান আবাসন সংকট মোকাবিলায় নীতিগত সংস্কার ছাড়া ভাড়াটিয়াদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ দূর করা সম্ভব হবে না।

