প্রায় ছয় বছর আগে কক্সবাজারে ভ্রমণে এসে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হওয়া এক অস্ট্রেলিয়ান নারী পর্যটকের মামলায় তিন আসামিকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড করা হয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে তাদের আরও এক মাস বিনাশ্রম কারাভোগ করতে হবে।
গতকাল সোমবার (৬ জুলাই) কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক (জেলা ও দায়রা জজ) রোকেয়া আক্তার দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে এ রায় ঘোষণা করেন। আদালতের বেঞ্চ সহকারী মোহাম্মদ শামীম রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের পেঁচারদ্বীপ গ্রামের আনছারুল্লাহ (২৪), আবদুল গফুর (২০) ও বেলাল উদ্দিন (৩০)। রায় ঘোষণার সময় তারা পলাতক থাকায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করেছেন। এ মামলায় অভিযুক্ত কাইমুল হক চৌধুরী শামীমের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন ট্রাইব্যুনালের স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ মীর মোশাররফ হোসেন টিটু।
যেভাবে ঘটেছিল ঘটনা:
মামলার নথি অনুযায়ী, অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক এলেসা ব্রুক এলিয়ট ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে কক্সবাজার ভ্রমণে এসে রামু উপজেলার পেঁচারদ্বীপ মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন ‘গুড ভাইবস কটেজ’-এ অবস্থান করছিলেন।
ওই বছরের ১৫ ডিসেম্বর রাত ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে তিনি ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় কয়েকজন ব্যক্তি কটেজের জানালার গ্রিল ও কাচ ভেঙে কক্ষে প্রবেশ করে। পরে তারা তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণের চেষ্টা চালায়। আত্মরক্ষার জন্য ওই নারী চিৎকার শুরু করলে আশপাশের মানুষ ও নিরাপত্তাকর্মীরা এগিয়ে আসার আশঙ্কায় অভিযুক্তরা পালিয়ে যায়।
এরপর ভুক্তভোগী জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করলে রামু থানার হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করেন। পরে তাকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ঘটনার পর ঢাকায় নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। একই সঙ্গে ঘটনাটি দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভুক্তভোগীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয় এবং তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ কটেজের কেয়ারটেকার আনছারুল্লাহ ও আবদুল গফুরকে গ্রেপ্তার করে।
দীর্ঘ বিচার শেষে রায়:
এ ঘটনায় রামু থানার হিমছড়ি পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) স্বরূপ কান্তি পাল বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। পরে মামলাটি কক্সবাজারের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এ বিচারের জন্য স্থানান্তর করা হয়। আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করেন।
বিচার চলাকালে ছয়জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ, মামলার আলামত উপস্থাপন, ভুক্তভোগীর চিকিৎসা প্রতিবেদন পর্যালোচনা, আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত রায় দেন।
রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(৪)(খ)/৩০ ধারার আওতায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সে কারণে তিন আসামিকে ১০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

