প্রায় ১৫ বছর আগে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে আট বছরের শিশু মাহফুজকে অপহরণের পর হত্যার ঘটনায় বহুল আলোচিত মামলার রায় দিয়েছেন আদালত। মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং দুইজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রত্যেকের বিরুদ্ধে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডও আরোপ করা হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (৭ জুলাই) ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এর বিচারক ফারজানা ইয়াসমিন এ রায় ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন জামাল শেখ, শামীম শেখ ও রঞ্জু শেখ। আর যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন মাহমুদা খানম উষা এবং বিল্লাল শেখ। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর নাজির মো. সুমন হাওলাদার।
রায় ঘোষণার সময় আদালত বলেন, এটি শুধু একটি হত্যা মামলা নয়; বরং মানুষের ছদ্মবেশে থাকা কিছু নিষ্ঠুর অপরাধীর হাতে এক নিষ্পাপ শিশুর মর্মান্তিক পরিণতির দলিল। আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও উল্লেখ করা হয়, সমাজে যেন ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের নৃশংস অপরাধ করার সাহস না পায়, সে জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রয়োজন।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১২ সালের ৫ জুলাই সন্ধ্যায় গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার বরাশুর গ্রামের বাড়ি থেকে ভাটিয়াপাড়া রেলওয়ে জামে মসজিদে যাওয়ার পথে মাহফুজকে অপহরণ করা হয়। এরপর অপহরণকারীরা তার পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করে।
অভিযোগে বলা হয়, মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে শিশুটিকে প্রায় দেড় মাস আটকে রাখা হয়। পরে ২০১২ সালের ২০ আগস্ট রাতে পূর্বপরিকল্পিতভাবে মাহমুদা খানম উষার বাড়িতে গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যার পর মরদেহ ভুক্তভোগী পরিবারের বাড়ির পাশের একটি মেহগনি বাগানে ফেলে রাখা হয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণে আরও উঠে আসে, শবে বরাতের রাতে নামাজ পড়তে বের হওয়ার পর মাহফুজ অপহরণের শিকার হয়। পরে অর্থ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মামলার অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, মাহফুজের বাবা তখন ইতালিতে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে আসামিদের পূর্বশত্রুতাও ছিল বলে তদন্তে উঠে আসে।
ঘটনার পরদিন, ২০১২ সালের ৬ জুলাই মাহফুজের মা স্বপ্না বেগম কাশিয়ানী থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করেন। তদন্ত শেষে একই বছরের ২০ নভেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. নিজাম শিকদার আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
মামলার গুরুত্ব বিবেচনায় ২০১৩ সালের ২২ ডিসেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন শাখার সিদ্ধান্তে এটি ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৪-এ স্থানান্তর করা হয়। এরপর ২০১৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়।
বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষের ২৫ জন সাক্ষীর মধ্যে ২৩ জন আদালতে সাক্ষ্য দেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আটজন সাফাই সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্য ও উপস্থাপিত প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। এর আগে একই মামলার দুই নাবালক আসামি মেহেদী ও সাদ্দামকে ২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর ১০ বছর করে আটকাদেশ দেওয়া হয়েছিল।

