দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকা বাংলাদেশের প্রজনন হার আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। সর্বশেষ জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে একমাত্র বাংলাদেশেই প্রজনন হার বেড়েছে।
জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির দুর্বলতা, গর্ভনিরোধক সরবরাহে ঘাটতি, মাঠপর্যায়ের সেবার সংকোচন এবং বাল্যবিয়ের মতো পুরোনো সমস্যার সঙ্গে নতুন কিছু নীতিগত দুর্বলতা যুক্ত হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা সতর্ক করে বলছেন, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অর্থনীতি, দারিদ্র্য এবং সামাজিক উন্নয়নের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউনিসেফের যৌথভাবে পরিচালিত মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে মোট প্রজনন হার ২০১৯ সালের ২ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২ দশমিক ৪-এ পৌঁছেছে। অর্থাৎ এখন একজন নারী গড়ে আগের তুলনায় বেশি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় স্থিতিশীল থাকার পর এই প্রথম প্রজনন হারে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর চিত্র বাংলাদেশের বিপরীত। পাকিস্তানে এখনো জন্মহার তুলনামূলক বেশি হলেও তা ধীরে ধীরে কমছে। অন্যদিকে ভারতে প্রজনন হার ইতোমধ্যে প্রতিস্থাপন স্তরের নিচে নেমে গেছে। ফলে বাংলাদেশের বর্তমান প্রবণতা নীতিনির্ধারকদের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
জনসংখ্যাবিদদের মতে, একসময় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি আগের মতো কার্যকর নেই। করোনা মহামারির সময় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পর সেই ঘাটতি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। পরিবারকল্যাণ কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দেওয়া কমে গেছে, তরুণ দম্পতিদের কাছে আধুনিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যকরভাবে পৌঁছানো যায়নি, গর্ভনিরোধক সরবরাহে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি হয়েছে এবং নীতিগত অগ্রাধিকারও কমে গেছে। এসব কারণ মিলেই প্রজনন হার আবার বাড়তে শুরু করেছে বলে মনে করছেন তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন জন্মহার কম থাকার কারণে এক ধরনের আত্মতুষ্টিও তৈরি হয়েছিল। ফলে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির ধারাবাহিকতা ও শক্তিশালী তদারকি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে। একই সময়ে কিছু পরিবারের মধ্যে দুইয়ের বেশি সন্তান নেওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক আমিনুল ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। প্রজনন হার নিয়ন্ত্রণে এখনই নতুন উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় নীতিগত আলোচনা এবং কার্যকর কর্মপরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রজনন হার বৃদ্ধির পেছনে গর্ভনিরোধক সরবরাহে ঘাটতি একটি বড় কারণ। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, করোনা মহামারির পর থেকে বিভিন্ন ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে যেখানে প্রায় ৯৯ লাখ কনডম সরবরাহ করা হয়েছিল, চলতি বছরের জানুয়ারিতে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭ লাখ ৫৪ হাজারে। একইভাবে খাবার বড়ি, ইনজেকটেবল, আইইউডি এবং ইমপ্ল্যান্টের সরবরাহেও বড় ধরনের পতন ঘটেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মহামারির সময় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পরও তা পূরণ করা যায়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি কর্মসূচির একটি পর্যায় শেষ হয়ে যাওয়ার প্রভাব। যদিও সরকার পরবর্তীতে নতুন ক্রয় প্রকল্প অনুমোদন করেছে, অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হওয়ায় সরবরাহ সংকট আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো জনবল সংকট। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের ৫০ হাজার ৬৪৮টি পদের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এখনো শূন্য রয়েছে। ফলে অনেক এলাকায় নিয়মিত পরিবার পরিকল্পনা সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীদের মধ্যে গর্ভনিরোধক ব্যবহারের হার ২০১৯ সালের ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ৫৮ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সময়ে আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির চাহিদা পূরণের হারও কমেছে।
অধ্যাপক আমিনুল ইসলামের মতে, এই সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে নিম্ন আয়ের পরিবারে। অনেকেই নিজের অর্থে গর্ভনিরোধক কিনতে পারেন না। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়ছে এবং দরিদ্র পরিবারগুলো আরও বেশি চাপে পড়ছে।
তিনি আরও বলেন, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিকায়ন করা হয়নি। মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তরুণ দম্পতিদের কাছে তথ্য ও পরামর্শ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও যথেষ্ট কার্যকর হয়নি।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক আশরাফী আহমদের মতে, বাল্যবিয়ে, কিশোরী মাতৃত্ব, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষা না থাকা এবং পরিবার পরিকল্পনাকে আগের মতো নীতিগত গুরুত্ব না দেওয়াও প্রজনন হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।
তিনি বলেন, বর্তমান নীতিমালার কারণে অবিবাহিতদের পরিবার পরিকল্পনা-সংক্রান্ত সেবা দেওয়া যায় না। ফলে অনেক তরুণ-তরুণী বিয়ের পরপরই জন্মনিয়ন্ত্রণ বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান ছাড়াই সন্তান ধারণ করেন। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য বিষয়ে পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি না হওয়ায় সমস্যাটি আরও জটিল হচ্ছে।
সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে এখনো ৪৭ শতাংশ বাল্যবিয়ে ঘটে। একই সঙ্গে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী প্রতি হাজার কিশোরীর মধ্যে সন্তান জন্মদানের হার ৮৩ থেকে বেড়ে ৯২-এ পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুটি সূচকই ভবিষ্যতে প্রজনন হার বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকার অবশ্য পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন হায়দার জানিয়েছেন, গর্ভনিরোধক সংগ্রহের কার্যক্রম চলছে এবং আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে মজুত পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকার এখন লক্ষ্যভিত্তিক জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার কৌশল গ্রহণ করবে। বিশেষ করে যেসব দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রজনন হার বেশি, তাদের জন্য আলাদা কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হবে। তার মতে, প্রজনন হার ২ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৪-এ বৃদ্ধি পাওয়া ইতিবাচক নয় এবং এটিকে আবার কমিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শতাংশের হিসাবে পরিবর্তন সামান্য মনে হলেও বাস্তবে এর অর্থ অতিরিক্ত বিপুলসংখ্যক শিশুর জন্ম। ফলে মাতৃস্বাস্থ্য, নবজাতক সেবা, টিকাদান, পুষ্টি কর্মসূচি, হাসপাতাল এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক শফিউন নাহিন শিমুলের মতে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর তুলনায় নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা বাড়লে অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দরিদ্র পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সন্তানসংখ্যা বেড়ে গেলে পরিবারের চিকিৎসা, শিক্ষা ও পুষ্টি ব্যয় বাড়বে। এতে অনেক পরিবার নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। পাশাপাশি মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু, অপুষ্টি এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জনসংখ্যাবিদদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু গর্ভনিরোধক সরবরাহ বাড়ালেই হবে না। মাঠপর্যায়ের পরিবার পরিকল্পনা সেবা শক্তিশালী করা, শূন্য পদ দ্রুত পূরণ, তরুণদের জন্য আধুনিক ও ডিজিটালভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য শিক্ষার বিস্তার—সবগুলো বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় দীর্ঘদিনের অর্জন হারিয়ে বাংলাদেশকে আবারও জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হতে পারে।

