চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক দেড় বছর পর চলতি ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় বিএনপি। প্রায় দুই দশক পর আবার ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্তি হয়েছে।
গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি শপথ নেওয়ার এক দিন পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে তিন অগ্রাধিকার ঠিক করে সরকার। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
এরপর কেটেছে ১৮০ দিন। স্বাভাবিকভাবেই সেই অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো কতখানি বাস্তবায়ন হয়েছে, ছয়মাস পরে সেই প্রশ্নই সামনে আসছে।
কেননা, গত ছয় মাসে দ্রব্যমূল্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নিয়েই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রক্রিয়া দেখা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সামাজিক উন্নয়নে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ বিএনপি সরকারের বেশ কিছু পদক্ষেপ ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
রাজনৈতিক সংস্কার বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের রায়কে গুরুত্ব না দেওয়ায় রাজনৈতিক সংকট তৈরির একটা শঙ্কাও দেখছেন বিশ্লেষকরা।
তবে সরকারের দাবি, বিএনপি সরকারের ছয় মাসের যে লক্ষ্যমাত্রা যা ছিল তা মোটামুটি শতভাগের কাছাকাছি অর্জিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, “নির্বাচনের আগে বিএনপি যে অঙ্গীকার করেছিল আমরা কী কী করবো, সেটা এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে। গত ছয় মাসে সরকারের যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল আমি মনে করি তার অধিকাংশই পূর্ণ হয়েছে”।
বিএনপি সরকার গঠনের পর- সরকার ও বিরোধী দলীয় সংসদদের ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি না নেওয়া কিংবা রাষ্ট্রীয় খরচ কমাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেশ কিছু উদ্যোগও সাধারণ মানুষের কাছে প্রশংসিত হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন কেমন?
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে সারাদেশে নানা অপরাধ কর্মকাণ্ড ও ‘মব ভায়োলেন্স’ নিয়ে তীব্র সমালোচনা রয়েছে তখন থেকেই।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি খুব একটা উন্নত হয়নি বলেও জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে থাকে বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র।
সংস্থাটির এই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ছয় মাসে গণপিটুনি, রাজনৈতিক সংঘাত, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং কারাগারে মৃত্যুর অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে।
এই ছয় মাসে বিচার বর্হিভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে নয়টি। কারাগারে বন্দি বা বিচারধীন থাকার সময় মৃত্যু হয়েছে ৫৫ জনের, ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৩৬৫টি।
এই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুুলাই পর্যন্ত সময়ে মব সহিংসতায় মারা গেছে ১২০ জন।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে আরেকটি সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি বা এইচআরএসএস নামের একটি সংগঠন।
যদিও তাদের রিপোর্টে জানুয়ারি মাসের অপরাধ ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত তথ্যও যুক্ত রয়েছে। উল্লেখ্য জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
এইচআরএসএস এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম ছয় মাসে ৫২৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনার বিপরীতে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে এই সংখ্যা ছিল ৮৩০টি।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন- এই ছয় মাসে ১,৬২১ জন নারী সহিংসতার শিকার হয়েছেন, যা গত বছরের একই সময়ের ১,০৪২টি ঘটনার তুলনায় ৫৬ শতাংশ বেশি।
এছাড়াও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্যাম্পাসগুলো ক্ষমতাসীন ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দল এনসিপি ও জামায়াতের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে গত কয়েক মাসে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্সের শিক্ষক অধ্যাপক মুহাম্মদ উমর ফারুক বিবিসি বাংলাকে বলেন, “শুরুতে সরকারের মধ্যে যে কনসার্ন ছিল ধীরে ধীরে সে জায়গায় আসতে পারেনি। গত ছয় মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রত্যাশিত জায়গায় এখনো পৌঁছায়নি”।
তিনি মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সরকারের বিশেষ কোন পরিকল্পনা না থাকায় অপরাধ প্রবণতা কমছে না। যে কারণে- খুন, চাঁদাবাজি, নারীর প্রতি সহিংসতা কিংবা ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলোও বেড়ে চলছে।
অর্থনৈতিক সংস্কার কত দূর?
গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার যখন দায়িত্ব নেয় তখনও দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভঙ্গুর অবস্থার মধ্যেই ছিল। উচ্চ সরকারি ঋণ, দুর্বল ব্যাংকিং খাত ও বিনিয়োগ সংকট শুরু থেকেই সরকারের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে গেছে।
বিশেষ করে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে দুই অঙ্কে অবস্থান করছিল। বিনিয়োগের স্থবিরতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ধীরগতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকোচন, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং জনসেবার অবনতিতে মানুষের উদ্বেগ বাড়ছিল।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও অর্থনৈতিক খাতের উন্নয়নে বেশ কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করেছিল।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে উত্তরণে নতুন সরকারের জন্য ছয় মাস খুব বেশি সময় না হলেও সেটি একেবারে কম সময়ও না।
মিজ খাতুন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমরা দেখেছি সরকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দিকে হাটছে। বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়েছে। আগের মার্জ করা পাঁচটি ব্যাংককে কার্যকরে চেষ্টা করেছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক”।
তা সত্ত্বেও দ্রব্যমূল্য পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়নি।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে নেওয়া কিছু পদক্ষেপে সরকার যেমন ইতিবাচক বার্তা দিতে পেরেছে, তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নিয়োগসহ বেশি কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়েছে বলেও মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
তাদের মতে, বর্তমান সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমগুলো সরকারের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের একটি চিত্র তুলে ধরে।
তবে বিনিয়োগ কিংবা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়গুলোতে এখনো ঘাটতির রয়েছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদ মিজ খাতুন বলছিলেন, “অনেক শিল্প কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভাব ছিল। সরকার বন্ধ কারখানা চালু করার জন্য একটা ফান্ড তৈরি করেছে। অপচয় না হলে ফলাফলটা দেখা যাবে। ফলে কারখানা চালু হলে কর্মসংস্থানও তৈরি হবে”।
বাংলাদেশে গত চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি বেড়েই চলছে। ফলে দ্রব্যমূল্য ক্রমাগত বাড়ছে। যাতে নিম্ন ও সাধারণ আয়ের মানুষের এ নিয়ে অসন্তোষ আছে।
অর্থনীতিবিদ মিজ খাতুন বিবিসি বাংলাকে বলেন, “মূল্যস্ফীতি ও জীবন যাত্রার উচ্চ ব্যয়ের চাপটা কিন্তু রয়েই গেছে। আর্থিক নীতি, বাজার ব্যবস্থাপনা এসবের সম্মিলিত উদ্যোগ না নেই তাহলে মূল্যস্ফীতি কিন্তু কমবে না”।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি
বর্তমান সরকারের ছয় মাস মেয়াদে যে সব বিষয়গুলো সরকারকে সবচেয়ে ভোগান্তিতে ফেলেছে তার মধ্যে বিদ্যুৎ খাত ছিল অন্যতম।
বিশেষ করে লোডশেডিং এবং ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিলের মতো বিষয়গুলো বিএনপি সরকারকে সবচেয়ে বড় সমালোচনার মধ্যে ফেলেছে।
দেশজুড়ে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং তীব্র আকার ধারণ করেছে গত কয়েক মাসে। মধ্যরাতের পর দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকছে। এর ফলে গৃহস্থালির কাজ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনেও নানা প্রভাব পড়ছে।
এর সাথে নতুন করে এ মাসের শুরুতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনেক গ্রাহকদের পক্ষ থেকে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে জুন মাসের ব্যবহারের বিপরীতে পাওয়া বিল নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেকের দাবি, স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি বিল এসেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, “বিদ্যুতের মূল্য কী প্রক্রিয়ায় বাড়ানো হলো সেটি বোঝা যায় নি। সকালে উঠে অনেকে দেখলো বিল ডাবল হয়ে গেলো। এগুলো তো ভাল লক্ষণ না। ছয় মাসে অন্তত এই খাতটিকে স্থিতিশীল অবস্থায় রাখা যেতো। সেই জায়গায় এখনো আন্তরিক প্রচেষ্টা কোথায়”?
তবে বর্তমান সরকারের কাছে সবচেয়ে বেশি সংকট ছিল জ্বালানি খাত। বিশেষ করে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইরান-আমেরিকা-ইসরায়েল যুদ্ধের পর জ্বালানি সংকট মারাত্মক আকার ধারণ করে।
পরবর্তীতে গত মাসের শেষ দিকে হঠাৎই দেশজুড়ে গ্যাস সংকট তৈরি হয়। গ্যাস সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক এলাকার পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে ওঠে।
এমন পরিস্থিতিতে অগাস্টের শুরুর দিকে প্রথমবারের মতো সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে কর্মসূচি পালন করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। বিরোধী দল সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিও পালন করেন।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলছিলেন, “গ্যাস ও বিদ্যুৎ ছাড়া জীবন ও অর্থনীতি অচল। এই বিষয়টিকে পরবর্তী ধাপে সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। না হলে জীবন ও অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে”।
যদিও এই সংকটের কথা স্বীকার করছে বিএনপি। তবে, এটিকে সরকারের ত্রুটি হিসেবে দেখছে না বিএনপি।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বিবিসি বাংলাকে বলেন, “এটা হচ্ছে আর্ন্তজাতিক সংকটের কারণে, টার্মিনাল নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে। এইরকম একটা পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুৎ নিয়ে সংকট হচ্ছে। তারপরও আমি বলবো, এটা নিরসন হয়ে যাবে। দ্রুত কাজগুলো হচ্ছে”।
কূটনীতিক ক্ষেত্রে অর্জন কতটা?
অর্থনীতি, রাজনীতি কিংবা সুশাসন প্রশ্নে সরকারের নানা ঘাটতির বিষয়গুলো সামনে আসলেও বিশ্লেষকদের অনেকেই বিএনপি সরকারের কূটনীতিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।
এর একটি বড় কারণ হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিকে সামনে আনছেন।
চলতি বছরের দোসরা জুন মি. রহমান নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে সভাপতি নির্বাচিত হন।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ূন কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, “জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে জয়লাভকে বর্তমান সরকারের বড় কূটনীতিক সফলতা হিসেবে ধরতে পারি আমরা”।
গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর গত ২১ থেকে ২৬শে জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর ছিল তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। সফরকালে তিনি প্রথমে মালয়েশিয়া যান এবং পরে সেখান থেকে চীনে যান।
এই সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছিলেন, মালয়েশিয়ার শ্রম বাজার আবার চালু হওয়া, বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর এবং চীনের সাথে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষায় ‘টু প্লাস টু’ সমঝোতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মি. কবির বিবিসি বাংলাকে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরকেও আমরা সফলতা হিসেবে বলতে পারি। চীনের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ইকনোমিক করিডোরের প্রস্তাবটা আসলো, চীনারা তিস্তা প্রকল্পে ফিজিবিলিটি স্টাডিতে অংশগ্রহণ করবে। চীনের সাথে এই সম্পর্ককে সফলতা হিসেবে দেখি”।
তবে যে নেতিবাচক দিক নেই সেই কথা বলার সুযোগ নেই। কেননা, শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রতিবেশি দেশ ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের বেশ টানাপোড়েন তৈরি হয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইতিবাচক সম্পর্কের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছিল দুই দেশের পক্ষ থেকে।
এর মাঝে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিল সেদেশের সরকার। বিশেষ করে সেপ্টেম্বরে ব্রিকস সম্মেলনের জন্যও আলাদাভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
তবে রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়ে দিয়েছে, ভারত সফরের জন্য তারা অনুকূল পরিবেশের জন্য অপেক্ষা করছে।
দুপুরে ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম এক সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভারত সফর প্রসঙ্গে জানান, যদিও ‘উভয় দেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছে’।
“তবে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা গত পাঁচই আগস্ট নতুন দিল্লিতে যেভাবে প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন, তাতে এই প্রক্রিয়ার পরিবেশ বিনষ্ট হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছি। আমরা মনে করি, এই সফরের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন,” ব্রিফিংয়ে বলেন তিনি।
সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির মনে করেন, আলোচনার মাধ্যমে এই সফরটি সম্পন্ন হলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে হয়তো সেটি সহায়ক হতো।
End of বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর

রাজনীতি, সংস্কার ও সুশাসন
বাংলাদেশে গণ অভ্যুত্থানের পর বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সময় রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয়করণ, একতরফা নির্বাচন কিংবা সরকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। যে কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে রাষ্ট্র ব্যবস্থা সংস্কারের দাবি ওঠে।
এই সংস্কার বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার বেশ কয়েকটি কমিশন গঠন করেছিল। তাদের সুপারিশগুলো নিয়ে একটি ঐকমত্য কমিশনও গঠন হয়। এসব সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার ভিত্তিতে জুলাই সনদ তৈরি করা হয়েছিল, যার ওপর গণভোটও হয়। সেই গণভোটে ‘হ্যা’ বিজয়ী হয়।
কিন্তু বিএনপি নির্বাচনে জয়লাভের পর ওই গণভোট আদেশকে অবৈধ আখ্যা দিয়ে সংস্কার পরিষদের শপথ গ্রহণ না করায় শুরুতেই বিরোধী দলের সাথে একটা টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
এছাড়াও স্বাধীন বিচার বিভাগ, গুম কমিশন গঠন কিংবা দুর্নীতি দমনের মতো বেশ কিছু ইস্যুতে ছয় মাস পার হতে চললেও এখনো দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি দেখা যায়নি বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় আইন অনুমোদন করা করা, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশের কার্যকারিতা না রাখা, পুলিশ সংস্কারে কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হতাশা তৈরি করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, “বিএনপির কাছে মানুষের প্রত্যাশা ছিল বিএনপি পরিবর্ত বা সংস্কারে গুরুত্ব দিবে। কিন্তু নির্বাচনের পর গত ছয় মাসে সুশাসন প্রতিষ্ঠা বা রাজনৈতিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলোতে কোন ইতিবাচক পরিবর্তন মানুষ দেখতে পায়নি”।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন বা সংস্কার ইস্যুতে বিএনপির এই অবস্থানের কারণে ছয় মাস যেতে না যেতেই এরই মধ্যে মাঠের আন্দোলনে নামার ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপি জোট।

