বাংলাদেশে একসময় প্রায় অজানা ও অত্যন্ত বিরল হিসেবে বিবেচিত কমলাবতী সাপের উপস্থিতি এখন গবেষকদের নতুন করে ভাবাচ্ছে। মাত্র সাড়ে পাঁচ বছর আগে দেশে প্রথমবারের মতো এই প্রজাতির সন্ধান মিললেও এরপর থেকে উত্তরাঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে এর দেখা পাওয়া যাচ্ছে।
বিশেষ করে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও অঞ্চলে এ পর্যন্ত কয়েক ডজন কমলাবতী সাপ উদ্ধার হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—বিরল এই সাপের সংখ্যা কি সত্যিই বাড়ছে, নাকি আগে থেকেও ছিল কিন্তু নজরে আসেনি?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর এখনই দেওয়া সম্ভব নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, মানুষের কারণে আবাসস্থল ধ্বংস, পরিবেশগত পরিবর্তন এবং সাপের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র বদলে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও তথ্য সংরক্ষণের কার্যক্রম বাড়ায় আগে অজানা অনেক প্রজাতিই এখন নথিভুক্ত হচ্ছে।
কমলাবতী নামে পরিচিত এই সাপটির বৈজ্ঞানিক নাম অলিগোডন খেরিনসিস। উজ্জ্বল কমলা-লাল রঙের কারণে স্থানীয়ভাবে এটি কমলাবতী নামে পরিচিতি পেয়েছে। এর মাথার গঠনও অন্যান্য সাধারণ সাপের তুলনায় কিছুটা আলাদা। আকারে এটি খুব বড় নয় এবং সাধারণত মাটির নিচে বা নরম মাটিযুক্ত এলাকায় বসবাস করতে পছন্দ করে।
বিশ্বে এই প্রজাতির সাপের উপস্থিতির ইতিহাসও বেশ সীমিত। ১৯৩৬ সালে ভারতের উত্তরপ্রদেশে প্রথম এটি শনাক্ত হয়। এরপর দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভারত ও নেপালের কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকায় খুব অল্প সংখ্যকবার এই সাপের দেখা মেলে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে প্রথমবার এটি উদ্ধার হওয়ার পর আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকীতে বাংলাদেশের নামও এই প্রজাতির বিস্তৃতির তালিকায় যুক্ত হয়।
বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারী ও গবেষণা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে অন্তত ৬৬টি কমলাবতী সাপ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১২ থেকে ১৩টি ছিল বাচ্চা এবং বাকিগুলো পূর্ণবয়স্ক। তবে আরও কয়েকটি সাপ উদ্ধার হলেও সেগুলোর আনুষ্ঠানিক তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।
সর্বশেষ চলতি জুলাই মাসের ৫ ও ৬ তারিখে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার একটি কৃষিজমিতে মাছ ধরার রিং জালে দুটি কমলাবতী সাপ ধরা পড়ে। উদ্ধারকারীদের দাবি, এবার পাওয়া সাপগুলোর একটি প্রায় সাড়ে তিন ফুট লম্বা, যা বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া এই প্রজাতির সবচেয়ে বড় সাপ।
এর আগে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলায় বাঁশঝাড় খননের সময় একটি পূর্ণবয়স্ক মাদি সাপের সঙ্গে আটটি সদ্য ফুটে বের হওয়া বাচ্চাও পাওয়া যায়। এ ঘটনা গবেষকদের ধারণা দিয়েছে যে, একটি কমলাবতী সাপ একবারে আট থেকে ১২টি পর্যন্ত ডিম দিতে পারে। যদিও এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সাপ বিষধর নয় এবং মানুষের জন্য তেমন কোনো হুমকি সৃষ্টি করে না। এটি অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের এবং সাধারণত মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে। একাকী থাকতে পছন্দ করে বলে একে খুব কমই চোখে পড়ে।
গবেষকদের ভাষ্য, কমলাবতী সাপের খাদ্যাভ্যাস, প্রজনন, জীবনচক্র কিংবা প্রাকৃতিক আচরণ সম্পর্কে এখনো খুব সীমিত তথ্য রয়েছে। ফলে এই প্রজাতি নিয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশের তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাতের ধরন এবং বন্যার প্রকোপ বদলে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু মানুষের ওপর নয়, বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ওপরও পড়ছে। ফলে অনেক প্রাণী তাদের প্রচলিত আবাসস্থল ছেড়ে নতুন এলাকায় চলে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায়, বনভূমি কমে যাওয়া, কৃষিজমির সম্প্রসারণ, নতুন স্থাপনা নির্মাণ এবং মানুষের ক্রমবর্ধমান কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক সাপ নিরাপদ আবাস হারাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তারা তুলনামূলক উপযোগী পরিবেশে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এই স্বাভাবিক স্থানান্তর বা মাইগ্রেশন-এর ফলেও উত্তরাঞ্চলে কমলাবতী সাপের উপস্থিতি বাড়তে পারে।
গবেষকদের আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও ভৌগোলিকভাবে হিমালয়ের পাদদেশের খুব কাছাকাছি অবস্থিত। এই অঞ্চল তুলনামূলক উঁচু ভূমি হওয়ায় হিমালয়সংলগ্ন এলাকার অনেক প্রাণীর জন্য এটি উপযোগী আবাসস্থল হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে ভারতের হিমালয়সংলগ্ন এলাকা কিংবা নেপাল থেকে এই অঞ্চলে সাপটির বিচরণ অস্বাভাবিক নয়।
তবে গবেষকরা এটিও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বর্তমানে সাপটি আগের তুলনায় বেশি দেখা গেলেও এটিকে সংখ্যাবৃদ্ধির নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে ধরা ঠিক হবে না। কারণ অতীতে অনেক প্রজাতির সাপই নথিভুক্ত হয়নি। বর্তমানে উদ্ধারকর্মী, গবেষক এবং সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ায় বিরল প্রজাতিগুলো আগের চেয়ে বেশি শনাক্ত হচ্ছে।
এখন পর্যন্ত কমলাবতী সাপ আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘের বৈশ্বিক ঝুঁকির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ফলে এটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে কি না বা কোন সংরক্ষণ শ্রেণিতে পড়বে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। গবেষকরা আশা করছেন, চলমান তথ্য সংগ্রহ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে ভবিষ্যতে এই প্রজাতির প্রকৃত অবস্থা আরও স্পষ্ট হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিরল হলেও কমলাবতী সাপ মানুষের জন্য ভয় বা আতঙ্কের কারণ নয়। বরং এটি বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই কোথাও এই সাপ দেখা গেলে হত্যা না করে বন বিভাগ বা প্রশিক্ষিত বন্যপ্রাণী উদ্ধারকারীদের খবর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

