রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত নগরায়ণ, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দুর্যোগের সময় উদ্ধার ও জরুরি সেবার দায়িত্বে থাকা হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোর অনেকগুলোই এখনও কাঠামোগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানলে এসব স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলে উদ্ধার অভিযান, চিকিৎসাসেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ত্রাণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় ধরনের দুর্যোগের সময় সবচেয়ে বেশি কার্যকর থাকার কথা যেসব প্রতিষ্ঠানের, সেগুলোরই যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হয়, তাহলে পুরো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাই সংকটে পড়ে যেতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ সরকারি অবকাঠামোর দ্রুত মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং ভূমিকম্প-সহনশীল করে তোলার বিকল্প নেই।
২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনুভূত ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প এই ঝুঁকিকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। ওই ভূমিকম্পে দুই শিশুসহ অন্তত ১০ জন নিহত এবং এক হাজারের বেশি মানুষ আহত হন। ভূমিকম্পের সময় বিভিন্ন হাসপাতাল, বিশেষ করে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে রোগী, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওলজি বিভাগের এক সিনিয়র স্টাফ নার্স জানান, ভূমিকম্পের সময় ভবনটি প্রচণ্ডভাবে কেঁপে ওঠে। অধিকাংশ রোগী ও তাদের স্বজন আতঙ্কে নিচে নেমে যান। দায়িত্বে থাকা চিকিৎসাকর্মীদেরও চরম উদ্বেগের মধ্যে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়।
একই সময় হাসপাতালে ভর্তি থাকা এক শিশুর অভিভাবক জানান, ভূমিকম্পের মুহূর্তে তারা সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত ছিলেন। ভবনের ভেতরে অবস্থানরত রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে অনেকেই নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন।
উদ্বেগের বিষয় হলো, সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের কয়েকটি ভবন আগেই কাঠামোগতভাবে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। এরপরও সেখানে চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিকভাবেই চালু রয়েছে। শুধু এই হাসপাতাল নয়, রাজধানী এবং আশপাশের এলাকায় আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ ভবন একই ধরনের ঝুঁকি নিয়েই ব্যবহৃত হচ্ছে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত হাজারো ভবনের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়। পর্যায়ক্রমে তিন হাজার ২৫২টি ভবনের প্রাথমিক পর্যালোচনা শেষে ৫৭৯টি ভবনকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে ২২৯টি ভবনের বিস্তারিত প্রকৌশল মূল্যায়ন করা হয়।
এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে ৪২টি ভবনকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে দ্রুত ভেঙে ফেলার সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে আরও ১৮৭টি ভবনকে রেট্রোফিটিং বা কাঠামোগতভাবে শক্তিশালী করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
২০২৩ সালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সাত দিনের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন খালি করা এবং তিন মাসের মধ্যে সেগুলো অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হলেও আড়াই বছরের বেশি সময় পার হওয়ার পরও বাস্তবায়ন খুবই সীমিত। এখন পর্যন্ত মাত্র দুটি ভবন ভেঙে ফেলা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু প্রশাসনিক ধীরগতির নয়, বরং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতারও প্রতিফলন।
রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ভবনগুলোর বড় অংশই সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। এছাড়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতাল ভবনও এই তালিকায় রয়েছে। অথচ অনেক ভবনেই এখনও নিয়মিত শিক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আর্থিক সীমাবদ্ধতা, আইনি জটিলতা এবং বিকল্প অবকাঠামোর অভাবে অনেক ভবন দ্রুত অপসারণ বা পুনর্নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। কোথাও আদালতের স্থগিতাদেশ, আবার কোথাও অর্থসংকটের কারণে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে।
অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, দেশের ৫৩৭টি ফায়ার স্টেশনের মধ্যে ১১৯টিকেই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর অনেকগুলোই কয়েক দশক আগে নির্মিত এবং আধুনিক ভূমিকম্প সহনশীল নকশা অনুযায়ী তৈরি নয়।
তবে সংস্থাটি জানিয়েছে, রাজধানীর কয়েকটি পুরোনো ফায়ার স্টেশন ইতোমধ্যে পুনর্নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি নতুন কয়েকটি স্টেশন নির্মাণ এবং পুরোনো সদর দপ্তরকে ভূমিকম্প-সহনশীল অবকাঠামোয় রূপান্তরের কাজও চলছে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে রাজধানীর বাইরে থাকা আরও প্রায় ১২০টি ফায়ার স্টেশন থেকে অতিরিক্ত জনবল ও উদ্ধার সরঞ্জাম দ্রুত ঢাকায় আনা হবে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষিত কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকদেরও উদ্ধারকাজে যুক্ত করার প্রস্তুতি রয়েছে।
তবে নগর পরিকল্পনাবিদ ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু উদ্ধার পরিকল্পনা করলেই হবে না; উদ্ধার পরিচালনাকারী অবকাঠামো নিজেই যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই পরিকল্পনার কার্যকারিতা অনেকটাই কমে যাবে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ভূমিকম্পের পর হাসপাতাল সচল না থাকলে আহতদের চিকিৎসা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। একইভাবে স্কুল ও কলেজ ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেগুলোকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা সম্ভব হবে না।
প্রকৌশল বিশেষজ্ঞদের মতে, সব ভবনের জন্য ব্যয়বহুল সংস্কার প্রয়োজন নেই। তবে হাসপাতাল, ফায়ার স্টেশন, থানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যোগাযোগ অবকাঠামো এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত ঝুঁকি মূল্যায়ন ও রেট্রোফিটিং শুরু করা জরুরি।
তাদের মতে, কম খরচে দ্রুত ঝুঁকি নির্ধারণের জন্য র্যাপিড ভিজ্যুয়াল স্ক্রিনিং পদ্ধতি ব্যবহার করা যেতে পারে। এরপর প্রকৌশল মূল্যায়নের ভিত্তিতে যেসব ভবনের সংস্কার প্রয়োজন, সেগুলো ধাপে ধাপে ভূমিকম্প-সহনশীল করে তুলতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন, বাংলাদেশের ভূমিকম্পের নথিভুক্ত ইতিহাস তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত। তাই পরবর্তী বড় ভূমিকম্প কবে, কোথায় বা কত মাত্রায় হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়। এই অনিশ্চয়তার কারণেই প্রস্তুতি গ্রহণে সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই।
তাদের মতে, দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার সক্ষমতা নিশ্চিত করতে এখনই সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা হালনাগাদ, দ্রুত রেট্রোফিটিং এবং সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। অন্যথায় বড় ধরনের ভূমিকম্পে শুধু ভবন ধস নয়, উদ্ধার ও জরুরি সেবার পুরো ব্যবস্থাই অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

