বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট তীব্র লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় পাহাড়ি ও উপকূলীয় জেলাগুলোতে এক অভূতপূর্ব মানবিক বিপর্যয় নেমে এসেছে।
গত ১ জুলাই থেকে ১০ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত চলমান রেকর্ডভাঙা টানা ভারী বর্ষণ, আকস্মিক বন্যা, তীব্র জলাবদ্ধতা এবং প্রাণঘাতী পাহাড় ধসের ফলে চট্টগ্রাম বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন এবং মানবিক সংস্থাগুলোর যৌথ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে এ পর্যন্ত মোট ৩০ জন মানুষের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে এবং বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক তালিকায় নতুন করে কোনো ব্যক্তি নিখোঁজ থাকার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়নি, যদিও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ক্ষয়ক্ষতি ও নিখোঁজের অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনও চলমান রয়েছে। প্রাকৃতিক এই তাণ্ডব যেমন স্থানীয় বাংলাদেশী পরিবারগুলোকে গৃহহীন করেছে, তেমনই উখিয়ার বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া লাখো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জীবনকেও নতুন করে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
এলাকাভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই দুর্যোগে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে আন্তর্জাতিক পর্যটন নগরী ও শরণার্থী শিবির বেষ্টিত জেলা কক্সবাজার। এই এক জেলাতেই সর্বোচ্চ ১৯ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পেই পাহাড় ধসে মারা গেছেন ১৩ জন, রামুতে ১ জন, পেকুয়ায় ১ জন, চকরিয়ায় ১ জন, কক্সবাজার সদরে ২ জন এবং মহেশখালী/টেকনাফ অঞ্চলে ১ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় বা যাচাইয়ের তালিকায় রয়েছেন।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে, যেখানে প্রবল শহুরে বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং পাহাড় ধসে মোট ৫ জন মারা গেছেন, যার মধ্যে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ২ জন, বোয়ালখালীতে ১ জন এবং সাতকানিয়া/লোহাগাড়া অঞ্চলে ২ জন অন্তর্ভুক্ত। পাহাড়ি ও দুর্গম জেলা বান্দরবানেও লঘুচাপের তাণ্ডবে প্রাণ হারিয়েছেন মোট ৫ জন, যার মধ্যে বান্দরবান সদরে ২ জন, লামায় ১ জন, নাইক্ষ্যংছড়িতে ১ জন এবং আলীকদমে ১ জন পাহাড় ধসের শিকার হন। এছাড়া রাঙামাটি সদর এলাকায় পাহাড় ধসে আরও ১ জন নারীর মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে, এবং খাগড়াছড়ি জেলায় ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি ও বন্যার সৃষ্টি হলেও এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
এই আকস্মিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের পাঁচ জেলায় আশ্রয়, সুরক্ষা, স্বাস্থ্য এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন (WASH) ব্যবস্থার ওপর একটি বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। বন্যার পানিতে হাজার হাজার একর কৃষিজমি তলিয়ে যাওয়ায় এবং গ্রামীণ সড়ক ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় দূরবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলগুলো সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা স্থানীয় বাজার ব্যবস্থাকে অচল করে খাদ্য নিরাপত্তার চরম সংকট তৈরি করেছে।
বন্যার নোংরা পানিতে নলকূপ ও বিশুদ্ধ পানির উৎসসমূহ নিমজ্জিত হওয়ায় এবং ল্যাট্রিন উপচে পড়ায় ডায়রিয়া, চর্মরোগ ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণের মতো পানিবাহিত মহামারীর প্রাদুর্ভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে সাময়িকভাবে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর নারী, শিশু, প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা চরম মানসিক ট্রমা ও সুরক্ষাহীনতার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস এবং ‘প্রত্যাশী’সহ আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় এনজিওগুলো অনুসন্ধান, উদ্ধার এবং জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসাসেবা বিতরণে মাঠে নেমেছে।
তবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের আগামী দিনগুলোর ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস এবং পাহাড়ের সম্পৃক্ত মাটির গঠন নতুন করে আরও বড় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা এ অঞ্চলের মানবিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

