দেশের মানুষ যাতে চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী না হন, সে জন্য চিকিৎসকদের প্রতি রোগীর আস্থা ও বিশ্বাস পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, উন্নত চিকিৎসাসেবা, দায়িত্বশীল আচরণ এবং মানবিক মনোভাব নিশ্চিত করা গেলে প্রতিবছর চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যাওয়া প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার দেশের ভেতরেই রাখা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সারাদেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
শনিবার রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের চিকিৎসকদের দক্ষতা নিয়ে মানুষের কোনো সন্দেহ নেই। তবে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগীর সঙ্গে আন্তরিক আচরণ, সময়মতো সেবা এবং দায়িত্বশীলতা বাড়ানো জরুরি। তাঁর ভাষায়, আইন বা প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করা যায় না; এটি অর্জিত হয় চিকিৎসকের ব্যবহার, সততা এবং সঠিক চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে।
তিনি বলেন, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ উন্নত চিকিৎসার আশায় বিদেশে যান। এতে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে ব্যয় হয়। এই অর্থ দেশের স্বাস্থ্যখাতেই ব্যয় হওয়ার সুযোগ রয়েছে, যদি মানুষ দেশের হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারেন। সে লক্ষ্যেই চিকিৎসকদের আরও মানবিক হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সরকারের স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণ যাতে রোগ জটিল হওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যপরামর্শ পান, সে জন্য সারাদেশে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এসব কর্মীর প্রায় ৮০ শতাংশই নারী হবেন। তাঁরা পরিবারভিত্তিক স্বাস্থ্যপরামর্শ, রোগ প্রতিরোধ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য এবং প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবেন।
তিনি বলেন, একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কেবল হাসপাতাল নির্মাণের ওপর নির্ভর করে না। সচেতন পরিবার, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যবিষয়ক সঠিক জ্ঞান একটি সুস্থ সমাজ গঠনে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম’—এই নীতিকে সামনে রেখে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে পুনর্গঠন করছে। পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, হৃদরোগ এবং ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগ সম্পর্কে মানুষ যদি শুরুতেই সঠিক পরামর্শ পান, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই রোগ নিয়ন্ত্রণ বা নিরাময় সহজ হয়ে যায়। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং জীবনযাত্রায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে বহু রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্যখাতে সরকারের বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে শিক্ষা খাতের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ। বর্তমানে এটি মোট দেশজ উৎপাদনের ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে এই বরাদ্দ জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু বাজেট বাড়ানোই নয়, চিকিৎসাসেবা মানুষের নাগালের মধ্যে আনতেও সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হৃদরোগের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনেটর, পেরিফেরাল ভাসকুলার স্টেন্ট, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি অ্যাবলেশন ফাইবার, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর ভ্যাট ও কর কমানো হয়েছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে এসব কর পুরোপুরি প্রত্যাহারও করা হয়েছে, যাতে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় কমে আসে।
গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী জানান, দেশের ৫০০ উপজেলার মধ্যে বর্তমানে মাত্র পাঁচটিতে ১০০ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে। এই অবকাঠামো জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। ফলে অনেক রোগীকেই চিকিৎসার জন্য জেলা বা রাজধানীতে যেতে হয়। এই চাপ কমাতে বর্তমানে ৩১ থেকে ৫১ শয্যার প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হবে।
শিশুস্বাস্থ্য উন্নয়নের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো চালু হলে শিশুদের উন্নত চিকিৎসা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক থাকবে না; দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সহজলভ্য হবে।
হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বৈজ্ঞানিক উপায়ে মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালগুলোকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ রাখতে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা জোরদার করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মানবসম্পদ সংকট দূর করতে সরকার দ্রুত নতুন চিকিৎসক নিয়োগ দিচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইতোমধ্যে পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর শূন্যপদ দ্রুত পূরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, একজন চিকিৎসক কেবল রোগ নিরাময় করেন না, একজন অসহায় মানুষের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় হয়ে ওঠেন। একজন চিকিৎসকের আন্তরিক পরামর্শ ও মানবিক ব্যবহার অনেক সময় ওষুধের মতোই কার্যকর ভূমিকা রাখে। তাই চিকিৎসকদের পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি মানবিক গুণাবলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা মেডিকেল কলেজকে দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানসহ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও চিকিৎসকদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পাশাপাশি গবেষণা, শিক্ষা, সমাজসেবা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও ঢাকা মেডিকেল কলেজের অবদান অনস্বীকার্য।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা, চিকিৎসা ও চিকিৎসা শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে আরও বিকশিত হবে। অনুষ্ঠানের শেষে প্রতিষ্ঠানের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক, শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের অভিনন্দন ও ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ মিলন চত্বরে শান্তির প্রতীক হিসেবে পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। পরে তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে উন্মুক্ত মতবিনিময়ে অংশ নেন এবং তাঁদের বিভিন্ন সমস্যা ও প্রস্তাব মনোযোগ দিয়ে শোনেন। আলোচনায় শিক্ষক, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজকে বিশ্বমানের আধুনিক গবেষণা, শিক্ষা ও চিকিৎসাকেন্দ্রে উন্নীত করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

