রাজধানীর উত্তরায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা নিয়ে চলমান অসন্তোষ নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও পরীক্ষা গ্রহণ এবং প্রশ্নপত্রে ত্রুটির অভিযোগকে কেন্দ্র করে বুধবার (১৫ জুলাই ২০২৬) দুপুরে শিক্ষার্থীরা সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেন। একপর্যায়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অবরোধ করলে ওই এলাকায় যান চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে দুপুর ১টা ৩০ মিনিটে উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে শিক্ষার্থীরা জড়ো হতে শুরু করেন। পরে তারা বিক্ষোভ মিছিল করে সড়কে অবস্থান নেন। এতে উত্তরা এবং আশপাশের এলাকায় যানবাহনের চলাচল ব্যাহত হয়। অফিসফেরত যাত্রী, সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়া যাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক বৈরী আবহাওয়ার কারণে অনেক পরীক্ষার্থী নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেননি। জলাবদ্ধতা, ভারী বৃষ্টি এবং যোগাযোগব্যবস্থার সমস্যার কারণে অনেকের পরীক্ষা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের দাবি, এমন পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
শিক্ষার্থীরা আরও অভিযোগ করেন, ১৩ জুলাই অনুষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান প্রথমপত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি ছিল। এ কারণে তারা ওই পরীক্ষার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার দাবিও জানিয়েছেন।
আন্দোলনের অন্যতম দাবির মধ্যে রয়েছে—দুর্যোগ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা, ১৩ জুলাই বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।
এর আগে একই দিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দেশের আটটি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) দ্বিতীয় পত্র, হিসাববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র এবং যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। একই সময়ে মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে আরবি দ্বিতীয় পত্র এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ব্যবসায় সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা-২ বিষয়ের পরীক্ষাও নেওয়া হয়।
তবে দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে একই পরিস্থিতি ছিল না। জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ওই দিনের পরীক্ষা স্থগিত করা হলেও অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডে পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির মতে, চট্টগ্রাম ছাড়া বাকি শিক্ষা বোর্ডগুলোতে পরীক্ষা নেওয়ার মতো পরিবেশ ছিল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও একই সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়।
পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তের পর থেকেই শিক্ষার্থীদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। মঙ্গলবারও রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষা স্থগিতের দাবিতে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। বুধবার সেই আন্দোলন আরও সংগঠিত রূপ নেয় এবং উত্তরায় বড় ধরনের কর্মসূচি পালন করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরীক্ষা এবং দুর্যোগ পরিস্থিতিকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ দ্রুত বাড়ছে। একদিকে শিক্ষাবর্ষের সময়সূচি ঠিক রাখা সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের বাস্তব পরিস্থিতিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। ফলে প্রশাসনের সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ—শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখা এবং একই সঙ্গে পরীক্ষার্থীদের ন্যায্য উদ্বেগের কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে অভিভাবকদের একটি অংশও মনে করছেন, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে সব অঞ্চলের শিক্ষার্থীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা ও যাতায়াতে বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে, সেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করলে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমানো সম্ভব।

