বর্ষা মৌসুমে দেশে শিশুদের ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি যখন সবচেয়ে বেশি, ঠিক সেই সময়ই বন্ধ রয়েছে সরকার পরিচালিত ৮ হাজার সমাজভিত্তিক শিশু যত্ন কেন্দ্র। নতুন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব হওয়ায় গত বছরের ডিসেম্বর থেকে এসব কেন্দ্রের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।
এর ফলে প্রায় দুই লাখ শিশুর নিরাপদ আশ্রয় ও পরিচর্যার ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাজারো অভিভাবক ও পরিচর্যাকারী। শিশু নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি বর্ষায় শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
শেরপুরের বাজিতখিলা গ্রামের বাসিন্দা নুসরাত জাহান রিতুর মতো অনেক অভিভাবক এখন প্রতিদিন উদ্বেগ নিয়ে সন্তানদের দেখভাল করছেন। চার বছরের মেয়ে আফিয়া জান্নাত ও ১০ মাস বয়সী আরেক সন্তানকে নিয়ে সারাক্ষণ সতর্ক থাকতে হচ্ছে তাকে। বাড়ির পাশের পুকুর বর্ষার পানিতে ভরে যাওয়ায় কয়েক মিনিট পরপরই সন্তানদের খোঁজ নিতে হচ্ছে।
রিতু জানান, শিশু যত্ন কেন্দ্র চালু থাকাকালে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মেয়েকে সেখানে রেখে নিশ্চিন্তে এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারতেন। কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সন্তানদের নিরাপদে রেখে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ২০২২ সালে প্রায় ৩০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ, সুরক্ষা ও সাঁতার সুবিধা প্রদান’ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করে।
এই প্রকল্পের আওতায় দেশের ১৬ জেলার ৪৫টি উপজেলায় ৮ হাজার শিশু যত্ন কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। এসব কেন্দ্রে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় দুই লাখ শিশুর পরিচর্যা করা হতো। পাশাপাশি ১ হাজার ৬০০টি সুইম-সেইফ কেন্দ্রের মাধ্যমে ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানো হতো, যা ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছিল।
প্রকল্পের প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার পর গত ডিসেম্বর থেকে কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। নতুন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন না পাওয়ায় এখন পর্যন্ত সেবা পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি। এদিকে কেন্দ্রগুলো বন্ধ থাকার সময়ই শুরু হয়েছে বর্ষা মৌসুম, যখন দেশে শিশু ডুবে মৃত্যুর ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে।
ফাউন্ডেশন ফর ডিজাস্টার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশে ডুবে মারা গেছে ৫৮৩ জন। এর মধ্যে ৫২৭ জনই শিশু। গত বছর ডুবে মারা যায় ১ হাজার ৩১১ জন, যার প্রায় ৯০ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ১৮৪ জন ছিল শিশু। শুধু চলতি মাসেই অন্তত নয়টি শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে বাড়ির আশপাশেই অধিকাংশ শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এ সময় পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে মায়েরা গৃহস্থালি, কৃষিকাজ বা গবাদিপশুর পরিচর্যায় ব্যস্ত থাকেন। আগে এই সময়টাতেই শিশু যত্ন কেন্দ্রগুলো ছোট শিশুদের নিরাপদ পরিবেশে রাখত।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব কেন্দ্রে নিবন্ধিত কোনো শিশুর ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। ফলে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রগুলো কার্যকর ভূমিকা রেখেছে বলে তাদের দাবি।
শুধু নিরাপত্তাই নয়, শিশুদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশেও কেন্দ্রগুলোর ইতিবাচক প্রভাব ছিল। ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল ডেভেলপমেন্টের ২০২৫ সালের মূল্যায়নে দেখা গেছে, এসব কেন্দ্রে যাওয়া শিশুদের ভাষাগত দক্ষতা, চলাফেরার সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস তুলনামূলকভাবে বেশি উন্নত হয়েছে। একই সঙ্গে মায়েরা পড়াশোনা, কর্মসংস্থান কিংবা আয়বর্ধক কাজে সময় দিতে পেরেছেন।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার বাসিন্দা সানজিদা আক্তার বলেন, তার তিন বছরের ছেলে আগে নিয়মিত শিশু যত্ন কেন্দ্রে যেত। এখন সংসারের কাজ, অসুস্থ স্বজনের দেখাশোনা, গবাদিপশুর পরিচর্যা এবং ছোট শিশুকে একসঙ্গে সামলানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আগে যে সেলাইয়ের কাজ করে কিছু আয় করতেন, সেটিও বন্ধ হয়ে গেছে।
অভিভাবকদের মতে, বর্তমানে অনেক ছোট শিশু দীর্ঘ সময় পর্যাপ্ত তদারকি ছাড়াই থাকে। কেউ কেউ বয়স্ক দাদা-দাদি বা নানা-নানির কাছে থাকলেও তাদের পক্ষে সার্বক্ষণিক নজর রাখা সম্ভব হয় না। এতে ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি যেমন বেড়েছে, তেমনি শিশুরা প্রাথমিক শিক্ষা, স্বাস্থ্যবিধি ও পুষ্টিসেবার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
শিশু যত্ন কেন্দ্র বন্ধ থাকায় শত শত নারী পরিচর্যাকারীও কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। শেরপুরের পরিচর্যাকারী রুপালী আক্তার জানান, জানুয়ারি থেকে ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কেন্দ্রটিও বন্ধ হয়ে গেছে। এই আয়ের ওপর তার পরিবার অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল। এখন এলাকার মায়েরা প্রায়ই জানতে চান, কেন্দ্র কবে আবার চালু হবে।
আরেক পরিচর্যাকারী লতিফা খাতুন বলেন, নিজের সন্তান না থাকলেও কেন্দ্রের ২০ থেকে ২৫টি শিশুই ছিল তার পরিবারের মতো। কেন্দ্র বন্ধ হওয়ার পর যেমন আয়ের উৎস হারিয়েছেন, তেমনি শিশুদের সঙ্গ থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়েছেন।
প্রকল্প পরিচালক তারিকুল ইসলাম চৌধুরী জানান, প্রায় ৮৩৮ কোটি টাকার নতুন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় কর্মসূচি ১৬ জেলার পরিবর্তে ৩০ জেলা এবং ৪৫ উপজেলার পরিবর্তে ৭৯ উপজেলায় সম্প্রসারণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে সারা দেশে ১৩ হাজারের বেশি শিশু যত্ন কেন্দ্র চালু করা হবে। শিশু যত্ন ও সুইম-সেইফ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ১০ লাখ ৬ হাজার শিশাকে সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি পরিচর্যাকারীদের মাসিক ভাতা ৪ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্প অনুমোদন পেলেই বন্ধ থাকা কেন্দ্রগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে সরকারি ক্রয়বিধি অনুযায়ী বেসরকারি সংস্থা নিয়োগসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করতে মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হতে আরও পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে।
নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন বলেন, প্রকল্পটি বর্তমানে পরিকল্পনা কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে। দ্রুত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা আয়োজনের জন্য কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে কেন্দ্রগুলো কবে চালু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময় জানানো সম্ভব হয়নি।
জনস্বাস্থ্য ও শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিশু ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রকল্পনির্ভর না রেখে রাজস্ব বাজেটের আওতায় স্থায়ী কর্মসূচি হিসেবে পরিচালনা করা প্রয়োজন। তাদের মতে, উন্নয়ন বাজেট নতুন এলাকা সম্প্রসারণে ব্যবহার করা যেতে পারে, কিন্তু বিদ্যমান সেবা বন্ধ হয়ে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে শিশুদের জীবন ও নিরাপত্তার ওপর।
সমষ্টি মিডিয়া কমিউনিকেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের মীর মাসরুর জামান বলেন, প্রকল্প শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেবা বন্ধ হয়ে গেলে প্রশিক্ষিত জনবল ছড়িয়ে পড়ে এবং কমিউনিটিভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে যায়। তাই শিশু সুরক্ষার এ ধরনের কার্যক্রমকে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই ভিত্তিতে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

