রাজধানী ঢাকায় ৭ থেকে সাড়ে ৭ মাত্রার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানলে প্রায় সাড়ে ৮ লাখ ভবন ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ভূতাত্ত্বিক ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা।
তাঁদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ফল্ট লাইনে বিপুল পরিমাণ শক্তি জমে থাকায় বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ভবন নির্মাণে জাতীয় বিল্ডিং কোডের কঠোর বাস্তবায়ন, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা সংস্কার এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় সমন্বিত প্রস্তুতি এখন সময়ের দাবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ তিনটি সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট—ভারতীয়, ইউরেশীয় এবং বার্মা প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ঢাকার কাছেই রয়েছে মধুপুর ফল্ট এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রয়েছে ডাউকি ফল্ট ব্যবস্থা। দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে এসব ফল্টে বড় ধরনের শক্তি নির্গত না হওয়ায় ভূগর্ভে বিপুল চাপ জমে রয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। ওই ঘটনায় সারা দেশে ১০ জনের মৃত্যু এবং শত শত মানুষ আহত হন। এরপরও একাধিক কম্পন অনুভূত হয়েছে, যেগুলোকে ভূগর্ভে জমে থাকা শক্তির আগাম সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন ভূতাত্ত্বিকরা।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর ও আশপাশের এলাকায় বর্তমানে প্রায় ২১ লাখ ভবন রয়েছে। এর মধ্যে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭২ হাজার দুর্বল ভবন পুরোপুরি ধসে পড়তে পারে। এতে স্বল্প সময়ের মধ্যে ৩ থেকে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। আর আরও শক্তিশালী ভূমিকম্প হলে সাড়ে ৮ লাখ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধসে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর চারতলার বেশি উচ্চতার ভবনের প্রায় ৪০ শতাংশই উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় টিনশেড ও দুর্বল কাঠামোর ঘরবাড়ি ধসে ব্যাপক প্রাণহানির সম্ভাবনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে। এসব স্থানে বালু ও নরম পলিমাটি থাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় মাটি তরলের মতো আচরণ করতে পারে। ফলে বহুতল ভবন দেবে যাওয়া বা হেলে পড়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, ভূমিকম্প কখন হবে তা আগে থেকে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতির বিকল্প নেই। তাঁর মতে, অতীতে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি ছিল। এখন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কারণ, ভূমিকম্পে অধিকাংশ প্রাণহানিই ভবন ধসের কারণে ঘটে।
রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী মো. আমিনুর রহমান বলেছেন, ভবন নির্মাণে মান নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হলেও ভূমিকম্প ঝুঁকি কমাতে নিয়মিত ও সমন্বিত কার্যক্রম এখনও পর্যাপ্ত নয়।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে ঢাকার উচ্চ ঝুঁকির প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে—জলাশয় ভরাট করে নির্মাণ, বিল্ডিং কোড না মেনে ভবন নির্মাণ, সরু সড়কের কারণে উদ্ধারকাজে বাধা, অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ, পুরোনো ভবনের নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা না হওয়া, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সংস্কারের উদ্যোগের অভাব, বিস্তৃত গ্যাসলাইনের কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি, পানি ও পয়োনিষ্কাশন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি এবং বড় ধরনের উদ্ধার অভিযানের জন্য পর্যাপ্ত সরঞ্জাম ও সক্ষমতার ঘাটতি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভূমিকম্প ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে যথাযথ পরিকল্পনা, প্রকৌশলগত মানদণ্ড এবং দুর্যোগ প্রস্তুতির মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। জাপান ও চিলির মতো দেশগুলো এ ক্ষেত্রে সফল উদাহরণ।
তাঁদের সুপারিশ অনুযায়ী, নতুন ভবন নির্মাণে বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, নির্মাণের আগে মাটির লিকুইফ্যাকশন পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের রেট্রোফিটিং, খোলা জায়গা সংরক্ষণ, কমিউনিটি পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুত করা, ঢাকার বিকেন্দ্রীকরণ, পুরান ঢাকার সরু সড়ক প্রশস্ত করা এবং পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র গড়ে তোলার মতো পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্প-পরবর্তী প্রথম কয়েক ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাই শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত মহড়া এবং আধুনিক উদ্ধার সক্ষমতা গড়ে তোলাও সমান জরুরি।

