টানা আট দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রাম বিভাগের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই দুই খাতেই মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। একই সঙ্গে ৪৪ হাজার ৭৯৩ হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরাসরি লোকসানের মুখে পড়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৩৫ জন কৃষক।
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বন্যার পানিতে বিভাগের ৩১৮টি ইউনিয়নের ২৩ হাজার ৬১০টি পুকুর ও জলাশয় এবং ৭৮৯টি চিংড়ি ঘের তলিয়ে গেছে। এতে মৎস্য খাতে আনুমানিক ২১০ কোটি ১০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বন্যার তীব্র স্রোতে ভেসে গেছে ৬ হাজার ৮৩০ দশমিক ২৬ টন বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, ৯৭৫ দশমিক ৪৮ টন চিংড়ি, ৭ কোটি ৬৬ লাখ ৯০ হাজার মাছের পোনা এবং ২ কোটি ২১ লাখ চিংড়ির রেণু।
জেলা ভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রামে। জেলাটিতে মৎস্য খাতের ক্ষতির পরিমাণ ১৪৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে বাঁশখালীতে ৫১ কোটি ৬৩ লাখ, সাতকানিয়ায় ৩৭ কোটি ২৪ লাখ এবং চন্দনাইশে ১৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকার মাছের ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজারে ৪৬ কোটি ২২ লাখ, নোয়াখালীতে ১১ কোটি ৯ লাখ, রাঙামাটিতে ৩ কোটি ১৫ লাখ, খাগড়াছড়িতে ২ কোটি ৫০ লাখ এবং বান্দরবানে ২ কোটি ১৪ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি প্রাক্কলন করা হয়েছে।
বন্যায় ৫ হাজার ৪২০ দশমিক ৭২ হেক্টর পুকুর এবং ৩ হাজার ৬৮ দশমিক ২৭ হেক্টর চিংড়ি ঘের পানির নিচে চলে যায়। পাশাপাশি স্লুইস গেট, বাঁধসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর প্রায় ১১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। জাল, নৌকা ও মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মৎস্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় উপপরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের বড় অংশই ক্ষুদ্র মৎস্যচাষি, যাদের জীবিকা পুরোপুরি মাছ চাষের ওপর নির্ভরশীল। তাদের জন্য সরকারি প্রণোদনার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে এই সহায়তা ক্ষতির পুরোটা পুষিয়ে দিতে পারবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ থেকে ১১ জুলাইয়ের টানা ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও নোয়াখালী জেলার আউশ ধান, আমনের বীজতলা, গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি, ফলের বাগান, মরিচের ক্ষেত এবং পানের বরজ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মোট ক্ষতিগ্রস্ত ৪৪ হাজার ৭৯৩ হেক্টর জমির মধ্যে নোয়াখালীতে ২৪ হাজার ৫৯৬ হেক্টর, চট্টগ্রামে ১৫ হাজার ৭১৬ হেক্টর এবং কক্সবাজারে ৪ হাজার ২১১ হেক্টর জমি রয়েছে। এ ক্ষতির প্রভাব পড়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৩৫ জন কৃষকের ওপর।
ডিএই-এর অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত যাচাই-বাছাই চলছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই সরকারের কাছে প্রণোদনার প্রস্তাব পাঠানো হবে।
প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতি ৭৭ কোটি টাকার বেশি:
বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির ৪৫টি উপজেলার ১৯১টি ইউনিয়নে প্রাণিসম্পদ খাতে মোট ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বন্যার কারণে ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৯০টি গরু, ৪ হাজার ৭৫৫টি মহিষ, ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৭টি ছাগল, ২৯ হাজার ২১২টি ভেড়া, ২৮ লাখ ৫০ হাজার মুরগি এবং ৭০ হাজার ৭০টি হাঁস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া মারা গেছে ৭১টি গরু, ১৬৫টি ছাগল, ৫০টি ভেড়া, ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০টি মুরগি এবং ২ হাজার ৫০৮টি হাঁস। এতে সরাসরি প্রায় ৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বন্যার পানিতে ১০ হাজার ৪৮০ একর চারণভূমি তলিয়ে যাওয়ায় ৪ হাজার ৭৫৬টি খামার ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে ৯১০ টন পশুখাদ্য, ১৪ হাজার ২৬৫ টন খড় এবং ৯ হাজার ১২৯ টন ঘাস নষ্ট হয়েছে। এসবের আর্থিক মূল্য যথাক্রমে ৫ কোটি ১৮ লাখ, ২১ কোটি ৫৭ লাখ এবং ৮ কোটি ২৬ লাখ টাকা।
বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পরিচালক মো. আতিয়ার রহমান জানান, এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো গবাদিপশুর রোগ ছড়িয়ে পড়ার খবর পাওয়া যায়নি। মাঠপর্যায়ে ভেটেরিনারি দল চিকিৎসা, ওষুধ বিতরণ ও টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বন্যা-পরবর্তী সময়ে রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ এবং পশুখাদ্যের সংকট মোকাবিলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে খামারিদের নেপিয়ার ঘাস চাষ ও সাইলেজ ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের সীমিত পরিসরে পশুখাদ্য সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।

