দেশের নগর ও স্বল্প দূরত্বের রেল যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ করার লক্ষ্য নিয়ে কেনা হয়েছিল অত্যাধুনিক ডেমু ট্রেন। যাত্রীদের দ্রুত, আরামদায়ক ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও কয়েক বছরের মধ্যেই সেই প্রকল্প কার্যত মুখ থুবড়ে পড়ে। বর্তমানে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ট্রেনগুলো কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ইয়ার্ডে বছরের পর বছর অচল অবস্থায় পড়ে আছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বগিতে মরিচা ধরেছে, ভেঙে গেছে জানালার কাচ, আর ট্রেনের ভেতর এখন পোকামাকড়ের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, ২০১৩-১৪ সালে চীন থেকে ২০ সেট ডিজেল ইলেকট্রিক মাল্টিপল ইউনিট (ডেমু) ট্রেন সংগ্রহ করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের ব্যয় হয় প্রায় ৬৫৪ কোটি টাকা। প্রতিটি ট্রেনে প্রায় ৩০০ যাত্রীর বসার ব্যবস্থা ছিল এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে প্রায় ৩০ বছর পর্যন্ত এসব ট্রেন চলাচল করতে পারবে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছিল।
তবে বাস্তবে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। ট্রেনগুলো চালুর দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই বিভিন্ন কারিগরি ত্রুটি দেখা দিতে শুরু করে। প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহে জটিলতা, দক্ষ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং সময়মতো মেরামতের উদ্যোগ না থাকায় একে একে সব ডেমু ট্রেন অচল হয়ে পড়ে।
পরবর্তীতে দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি ডেমু ট্রেন সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করা হলেও পরীক্ষামূলক সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। ফলে পুরো বহরই এখন ব্যবহারহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ইয়ার্ডে রাখা ট্রেনগুলোর বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় বৃষ্টি, রোদ ও প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় বগিগুলো দ্রুত নষ্ট হচ্ছে। দামি যন্ত্রাংশে মরিচা ধরেছে, অনেক জায়গায় ক্ষয় সৃষ্টি হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি বগির জানালার কাচ ভেঙে গেছে। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় এসব ট্রেনের ব্যবহারযোগ্যতা দিন দিন আরও কমে যাচ্ছে।
ডেমু ট্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের ওপর। একসময় এসব ট্রেনে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যাত্রী সহজে যাতায়াত করতেন। যাত্রীদের মতে, ট্রেনগুলো আবার চালু করা গেলে নগর ও উপশহরাঞ্চলের যাতায়াত অনেকটাই স্বস্তিদায়ক হতে পারে এবং সড়কপথের ওপর চাপও কমবে।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, ডেমু ট্রেন মূলত স্বল্প দূরত্বে যাত্রী পরিবহনের জন্য কেনা হয়েছিল। বর্তমানে সরকারি অর্থায়নে এসব ট্রেন সংস্কারের কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে অচল ট্রেনগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
পরিবহন খাতের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, রাষ্ট্রের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রক্ষায় দ্রুত কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকলে ট্রেনগুলো সম্পূর্ণ অচল হয়ে যেতে পারে, তখন পুনরুদ্ধারের ব্যয় আরও বেড়ে যাবে অথবা সেগুলো বাতিল করা ছাড়া অন্য কোনো পথ থাকবে না।
তাঁদের মতে, প্রয়োজন হলে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে ট্রেনগুলো পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে একদিকে রাষ্ট্রের বিনিয়োগের একটি অংশ উদ্ধার হবে, অন্যদিকে নগর ও শহরতলির যাত্রীদের জন্য আবারও স্বল্প দূরত্বের রেলসেবা চালুর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ৬৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা ডেমু ট্রেনগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। দ্রুত সংস্কার করে সেবায় ফিরিয়ে আনা হবে, নাকি একসময় এগুলো পরিত্যক্ত সম্পদ হিসেবে ভাঙারিতে বিক্রি করতে হবে—সেই সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহল।

