রাজধানীর দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যা সমাধান এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে মনোরেল চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৯ সালের আগেই মনোরেল চালু করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
প্রকল্পের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই বা প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে (বুয়েট)। সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী ধাপে নির্মাণকাজ শুরু হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকার যানজট নিরসনে মনোরেল চালুর বিষয়টি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন এই সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেট্রোরেলের তুলনায় মনোরেল নির্মাণে সময় ও ব্যয় তুলনামূলক কম হতে পারে। কারণ, মনোরেলের জন্য সড়কের মাঝখানে একটি সরু পিলার স্থাপন করলেই অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব। ফলে কম জায়গার মধ্যে, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ও সরু সড়ক এলাকায় এ ব্যবস্থা চালু করা সহজ।
বিদ্যুৎচালিত এই পরিবহন ব্যবস্থায় রাবারের চাকা ব্যবহৃত হওয়ায় শব্দদূষণও তুলনামূলক কম হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মনোরেলের বিভিন্ন রুট মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোর সঙ্গে সংযোগকারী ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে। এতে যাত্রীদের এক পরিবহন থেকে অন্য পরিবহনে যাতায়াত আরও সহজ হবে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, মনোরেল, মেট্রোরেল ও বাস সার্ভিস—এই তিন ব্যবস্থাকে সমন্বয় করে ঢাকায় একটি আধুনিক গণপরিবহন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, মেট্রোরেলকে রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে ধরে ভবিষ্যতে জনবহুল এলাকাগুলোতে মনোরেল চালুর সম্ভাবনা বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে নগরবাসীর জন্য দ্রুত, নিরাপদ ও আরামদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।
পাঁচ রুটে মনোরেলের প্রাথমিক পরিকল্পনা:
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) সূত্র জানায়, যেসব এলাকায় রাস্তার প্রস্থ কম এবং প্রচলিত মেট্রোরেল নির্মাণ তুলনামূলক কঠিন, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে মনোরেলের রুট নির্ধারণ করা হয়েছে।
মনোরেল-১: বিমানবন্দর থেকে জলসিঁড়ি: প্রস্তাবিত প্রথম রুটটি হবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-কুড়িল-পূর্বাচল-জলসিঁড়ি আবাসন পর্যন্ত। প্রায় ২৫ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুট বিমানবন্দর এলাকার সঙ্গে পূর্বাচল নতুন শহর ও জলসিঁড়ি আবাসনকে যুক্ত করবে।
মনোরেল-২: বিমানবন্দর থেকে সাভার: দ্বিতীয় রুটটি হবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-উত্তরা সেন্টার-সাভার। প্রায় ১৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুট উত্তরা হয়ে সাভারের শিল্পাঞ্চল ও আবাসিক এলাকাগুলোর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ তৈরি করবে।
মনোরেল-৩: মোহাম্মদপুর থেকে পোস্তগোলা: তৃতীয় রুটে মোহাম্মদপুর-ধানমন্ডি-জিঞ্জিরা-পোস্তগোলা করিডরকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রায় ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুট ঢাকার পশ্চিমাঞ্চল থেকে বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারের কেরানীগঞ্জ হয়ে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াবে।
মনোরেল-৪: মধ্যবাড্ডা থেকে ভুলতা: চতুর্থ রুটটি হবে মধ্যবাড্ডা-পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে-ভুলতা (নারায়ণগঞ্জ)। প্রায় ১৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুট প্রগতি সরণির মধ্যবাড্ডা এলাকা থেকে পূর্বাচল হয়ে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা-গাউছিয়ার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে।
মনোরেল-৫: রামপুরা থেকে ডেমরা:
পঞ্চম রুটটি হবে রামপুরা-বনশ্রী-ডেমরা করিডর। প্রায় ১০ দশমিক ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুট পূর্ব ঢাকার বাসিন্দাদের চলাচল সহজ করার পাশাপাশি রামপুরা ও বনশ্রী এলাকার যানবাহনের চাপ কমাতে ভূমিকা রাখবে।
ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক ও সরকারের সচিব মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক করতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। মনোরেল যুক্ত হলে রাজধানীর মানুষ যানজটের ভোগান্তি থেকে অনেকটাই স্বস্তি পাবে। প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে দ্রুত মূল নির্মাণপর্বে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
রাজধানীর ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও যানজটের চাপ মোকাবিলায় মনোরেল প্রকল্পকে গণপরিবহন ব্যবস্থার নতুন সংযোজন হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন বুয়েটের সমীক্ষা ও পরবর্তী বাস্তবায়ন পরিকল্পনার ওপর নির্ভর করছে এই প্রকল্পের গতি।

