২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পুলিশের গুলি ও সহিংসতায় আহত হাজারো মানুষ এখনো শারীরিক ও মানসিক কষ্টের সঙ্গে লড়াই করছেন। কেউ হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি, কেউ স্থায়ীভাবে হারিয়েছেন অঙ্গের সক্ষমতা, আবার কেউ দীর্ঘ চিকিৎসার পরও পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। গুরুতর আহতদের একটি অংশ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হলেও অনেকের চিকিৎসা চলছে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গুরুতর আহত ১৫৪ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, রাশিয়া ও তুরস্কে পাঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০৫ জন চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরেছেন। বর্তমানে ৩৯ জন বিদেশে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের গুলি ও সহিংসতায় ৮৪৩ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৩৭০ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে অনেকেই এখনো নিয়মিত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের মধ্যে আছেন।
উত্তরার বাসিন্দা মো. রকিব উদ্দিন জুলাই আন্দোলনে আহতদের একজন। বর্তমানে তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উত্তরার আজমপুর এলাকায় আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলিতে আহত হন তিনি। গুলি লাগে কোমরের সামনে অংশে। সে সময় তার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা চলছিল।
আহত হওয়ার পর প্রথমে তাকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর রাতের দিকে তাকে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) নেওয়া হয়।
দীর্ঘ চিকিৎসায় তার পা ও কোমরে তিনটি বড় অস্ত্রোপচার হয়েছে। তবে এখনো পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি তিনি। তার ভাষ্য, পায়ের সমস্যা এখনো রয়ে গেছে, রাতে ঘুমাতেও কষ্ট হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে যাওয়া সম্ভব নাও হতে পারে।
পঙ্গু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক আবুল কেনান জানান, জুলাই আন্দোলনে আহত অনেকেই নিয়মিত ফলোআপে আসছেন। তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
আহতদের তিন শ্রেণিতে ভাগ করে সহায়তা:
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তর আহতদের শারীরিক ক্ষতির মাত্রা বিবেচনায় তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করেছে। পাশাপাশি প্রত্যেক আহত ব্যক্তিকে দেওয়া হয়েছে ‘হেলথ কার্ড’। এই কার্ডের মাধ্যমে তারা সরকারি হাসপাতাল এবং সরকার নির্ধারিত বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবেন।
সবচেয়ে গুরুতর আহতদের ‘ক’ শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। এ শ্রেণির অনেকে স্থায়ী প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়েছেন। যেমন—চোখের দৃষ্টি হারানো, হাত-পা হারানো বা শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের স্থায়ী ক্ষতি।
‘ক’ শ্রেণির আহতদের সংখ্যা ৯৯০ জন। তারা মাসিক ২০ হাজার টাকা ভাতা এবং এককালীন ৫ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন।
‘খ’ শ্রেণির আহতদের সংখ্যা ১ হাজার ৪১৭ জন। তারা গুরুতর আহত হলেও ‘ক’ শ্রেণির মতো স্থায়ী ক্ষতির মুখে পড়েননি। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন হওয়ায় তাদের মাসিক ১৫ হাজার টাকা ভাতা এবং এককালীন ৩ লাখ টাকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
‘গ’ শ্রেণির আহতদের সংখ্যা ১১ হাজার ৯৬৩ জন। তুলনামূলক কম গুরুতর আহত এই ব্যক্তিরা মাসে ১০ হাজার টাকা ভাতা এবং এককালীন ১ লাখ টাকা সহায়তা পাচ্ছেন।
বিদেশে চিকিৎসায় সরকারের ব্যয় শত কোটি টাকা:
আহতদের মধ্যে যাদের চিকিৎসা দেশে সম্ভব হয়নি, তাদের বিদেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও চীনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরাও বাংলাদেশে এসে আহতদের চিকিৎসায় পরামর্শ দেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে পাঠানো ১৫৪ জনের বেশিরভাগই গুলিতে আহত হন। তাদের মধ্যে অনেকে অর্থোপেডিক চিকিৎসা নিচ্ছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে চিকিৎসা নেওয়া আহতদের জন্য ১৫ মার্চ পর্যন্ত সরকারের ব্যয় হয়েছে ৩৪৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯৯ হাজার ২০৭ টাকা।
জুলাই আন্দোলনের সময় ছররা গুলিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন চোখের রোগীরা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় ৫০২ জন চোখে আঘাত পান। তাদের মধ্যে ২৮ জন স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। আরও প্রায় ১০০ জন এক চোখের দৃষ্টি হারিয়েছেন। এ ছাড়া গুরুতর আঘাত ও দেরিতে চিকিৎসা পাওয়ার কারণে অনেকের হাত বা পা কেটে ফেলতে হয়েছে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত ব্র্যাক লিম্ব সেন্টার আহতদের পুনর্বাসনে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মো. শাহিনুল হকের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ৩৪ জনকে কৃত্রিম পা এবং ৫ জনকে কৃত্রিম হাত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৬৮ জনকে শারীরিক সহায়ক উপকরণ দেওয়া হয়েছে। ১৪৭ জনকে মানসিক সহায়তা বা কাউন্সেলিং দেওয়া হয়েছে এবং ৬০ জন নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নিচ্ছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় আহতদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় নানা সীমাবদ্ধতার তথ্য উঠে এসেছে। রাজধানীর ৩৮টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের পরিস্থিতি নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, অনেক আহত ব্যক্তি সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারেননি। গবেষণায় উঠে আসে, পুলিশের ভয়, মামলা হওয়ার আশঙ্কা, যানবাহনের সংকট এবং রাস্তায় বাধার কারণে অনেকে হাসপাতালে যেতে পারেননি। আবার কিছু হাসপাতাল রোগী ভর্তি করতে দেরি করেছে বা অনীহা দেখিয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়, কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসায় বিলম্ব, পর্যাপ্ত জনবল ও ওষুধের সংকট, রোগীর তথ্য সংরক্ষণে দুর্বলতা এবং হাসপাতালগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। এ ছাড়া অনেক আহত ব্যক্তি গ্রেপ্তারের ভয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাননি। ফলে অনেকের শারীরিক জটিলতা বেড়েছে বলে গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহতদের অনেকেই এখনো নিয়মিত চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। সরকারি উদ্যোগে চিকিৎসা ও ভাতার ব্যবস্থা করা হলেও দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। আহতদের চিকিৎসা শুধু হাসপাতালের বিষয় নয়, বরং তাদের ভবিষ্যৎ জীবন পুনর্গঠনের বিষয় বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

