খুলনা শহর থেকে তেরখাদা উপজেলার দূরত্ব খুব বেশি নয়—মাত্র ২৩ থেকে ২৫ কিলোমিটার। তবে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ না থাকায় এই স্বল্প দূরত্বই দীর্ঘ ভোগান্তিতে পরিণত হয়েছে স্থানীয় মানুষের জন্য। বিশেষ করে তেরখাদার বিলগুলোতে উৎপাদিত শাকসবজি ও দেশীয় প্রজাতির মাছ খুলনা শহরের বাজারে পৌঁছাতে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয় কৃষকদের।
বর্তমানে জেলখানা ঘাট এলাকায় ভৈরব নদ পার হয়ে ট্রলারে করে কৃষিপণ্য নিয়ে শহরের পাইকারি বাজারে যেতে হয়। এতে সময় যেমন বেশি লাগে, তেমনি বাড়ে পরিবহন খরচ ও পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি। একই সমস্যায় পড়ছেন রূপসার সেনেরবাজার, দীঘলিয়া এবং নড়াইল জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরাও। দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের কারণে অনেক কৃষকই শহরের বাজারে পণ্য আনতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে অনেক সময় উৎপাদিত ফসল নষ্ট হচ্ছে, আবার অনেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্যমূল্য থেকেও।
তবে দীর্ঘদিনের এই সমস্যার অবসানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে খুলনার জেলখানা ঘাট এলাকায় সেতু নির্মাণে আগ্রহ দেখিয়েছে সেতু বিভাগ। এরই অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। শিগগিরই এ সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ শুরু হতে পারে।
খুলনা সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এর আগে খুলনা সড়ক বিভাগের আওতায় শ্রীফলতলা-সেনেরবাজার (জেড-৭০৪২) সড়কের প্রথম কিলোমিটারে ‘জেলখানা ঘাট সেতু নির্মাণ’ নামে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা)-এর অর্থায়নে প্রস্তাবিত ওই সেতুর দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছিল প্রায় ১ হাজার ৩০০ মিটার। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা।
ওই সময় সড়ক ও জনপথ বিভাগের ব্রিজ ম্যানেজমেন্ট উইং এবং সেতু ডিজাইন সার্কেলের কর্মকর্তারা এলাকাটি পরিদর্শন করেছিলেন। তবে বিভিন্ন জটিলতায় সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা আর এগোয়নি।
সম্প্রতি বিষয়টি আবার গুরুত্ব পেয়েছে। গত ১১ জুলাই প্রস্তাবিত জেলখানা ঘাট সেতুর স্থান পরিদর্শন করেন সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আবদুর রউফ। তিনি জানান, ভৈরব নদের ওপর এই সেতু নির্মাণ একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। নদীর নাব্যতা এবং দুই তীরের পরিবেশ ও অবকাঠামোগত ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে আধুনিক নকশায় সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এরপর ১৯ জুলাই খুলনা সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন এবং সম্ভাব্য উপকারভোগীদের সঙ্গে একটি সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়।
খুলনা সওজ সড়ক উপবিভাগ-২-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম হাওলাদার জানান, সেতুটির অবস্থান নিয়ে কয়েকটি বিকল্প বিবেচনা করা হচ্ছে। নগরপ্রান্তে কাস্টমঘাট এলাকার দিকে সেতুর সংযোগ সড়ক নেওয়ার সম্ভাবনাও যাচাই করা হচ্ছে। ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষ হলে সেতুর চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের আশা, জেলখানা ঘাটে সেতু নির্মাণ হলে খুলনা, তেরখাদা, দীঘলিয়া, রূপসা ও আশপাশের এলাকার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। বিশেষ করে কৃষকরা দ্রুত তাদের উৎপাদিত পণ্য শহরের বাজারে নিতে পারবেন। এতে পরিবহন ব্যয় কমার পাশাপাশি শাকসবজি ও পচনশীল পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ পৌঁছানোও সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় স্কুলশিক্ষক রবিউল ইসলাম বলেন, জেলখানা ঘাট দিয়ে প্রতিদিন কয়েক উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ মালামালসহ ঝুঁকি নিয়ে ভৈরব নদ পার হন। বর্ষা মৌসুমে এই দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। স্বাধীনতার এত বছর পরও গুরুত্বপূর্ণ এই স্থানে সেতু না থাকায় সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
রূপসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা রিক্তা বলেন, প্রতীক্ষিত সেতুটি নির্মিত হলে ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথে মানুষের চলাচল কমবে। পাশাপাশি কৃষিনির্ভর এলাকার অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

