দেশজুড়ে মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ—হঠাৎ কল কেটে যাওয়া, ধীরগতির ইন্টারনেট, দুর্বল নেটওয়ার্ক এবং অনিয়মিত সংযোগ। এসব সমস্যার কার্যকর সমাধানে এবার মোবাইল অপারেটরদের ওপর নজরদারি আরও জোরদার করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। মোবাইল সেবার মান মূল্যায়নের জন্য ব্যবহৃত ড্রাইভ টেস্ট পদ্ধতিকে আরও কঠোর ও আধুনিক করার অনুমোদন দিয়েছে সংস্থাটি।
নতুন এই পদ্ধতির লক্ষ্য হলো বাস্তব পরিস্থিতিতে গ্রাহকরা যে ধরনের মোবাইল সেবা পান, তার আরও নির্ভুল চিত্র পাওয়া এবং সেই অনুযায়ী অপারেটরদের জবাবদিহির আওতায় আনা।
ড্রাইভ টেস্টের সময় বিশেষ প্রযুক্তিসম্পন্ন যন্ত্রপাতি সংযুক্ত গাড়ি ব্যবহার করে বিভিন্ন এলাকায় নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। এতে কলের মান, ইন্টারনেটের গতি, সিগন্যালের শক্তি, নেটওয়ার্ক কভারেজ, তথ্য আদান-প্রদানের বিলম্বসহ বিভিন্ন সূচক পরিমাপ করা হয়। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে মোবাইল অপারেটররা নির্ধারিত সেবার মান বজায় রাখছে কি না, তা যাচাই করে বিটিআরসি।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত কমিশনের এক বৈঠকে নতুন এই পদ্ধতির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এটি ২০২১ সালে চালু হওয়া আগের কাঠামোর পরিবর্তে কার্যকর হবে এবং ২০২৫ সালে জারি করা সেবার মানসংক্রান্ত নির্দেশিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে।
বিটিআরসি জানায়, আগের মূল্যায়ন ব্যবস্থা বর্তমান প্রযুক্তিগত বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই ছিল না। তাই চারটি মোবাইল অপারেটরের মতামত, সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং পরীক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত সহায়তা নিয়ে নতুন কাঠামো চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বিটিআরসির প্রকৌশল ও পরিচালনা বিভাগের কমিশনার অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ইকবাল আহমেদ বলেন, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নতুন নির্দেশিকা জারি করা হয়, যেখানে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত মোবাইল নেটওয়ার্কের সেবার মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তার মতে, নতুন পদ্ধতিতে কীভাবে পরীক্ষা হবে এবং ফলাফল কীভাবে যাচাই করা হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে দেশের মোবাইল গ্রাহকরাই সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
নতুন নীতিমালার অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো তথ্য সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি। আগে প্রতিটি কার্যকারিতা সূচক মূল্যায়নে ন্যূনতম ৩০০টি নমুনা সংগ্রহ করা হতো। এখন সেই সংখ্যা বাড়িয়ে ৫০০ করা হয়েছে। বিটিআরসির মতে, বেশি তথ্য সংগ্রহের ফলে পরীক্ষার ফল আরও নির্ভরযোগ্য হবে এবং প্রকৃত অবস্থার প্রতিফলন পাওয়া যাবে।
ইন্টারনেটের গতি পরীক্ষার ক্ষেত্রেও এসেছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। আগে ৩০ মেগাবাইট আকারের তথ্য ব্যবহার করে ডাউনলোড গতি পরীক্ষা করা হলেও এখন ৫০ মেগাবাইটের তথ্য ব্যবহার করা হবে। এর ফলে অল্প সময়ের সর্বোচ্চ গতি নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে নেটওয়ার্ক কতটা স্থিতিশীলভাবে কাজ করছে, তা বোঝা সম্ভব হবে। আপলোড পরীক্ষার জন্য আগের মতোই ১০ মেগাবাইট আকারের তথ্য ব্যবহার করা হবে।
একই সঙ্গে পরীক্ষার সার্ভারের সক্ষমতাও বাড়ানো হয়েছে। আগে যেখানে ন্যূনতম ৩০০ মেগাবিট ব্যান্ডউইথ প্রয়োজন ছিল, এখন তা বাড়িয়ে অন্তত ১ গিগাবিট করা হয়েছে। এতে পরীক্ষার সময় সার্ভারের সীমাবদ্ধতার কারণে ফলাফলে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছে কমিশন।
বর্তমান সময়ে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্ক মূলত চতুর্থ প্রজন্মভিত্তিক হওয়ায় কলের মান পরীক্ষার পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের স্বয়ংক্রিয় মোডে পরীক্ষা চালানো হলেও এখন দ্বিতীয় ও চতুর্থ প্রজন্মের সমন্বিত মোড ব্যবহার করা হবে। পাশাপাশি আধুনিক ভয়েস প্রযুক্তির কল পরীক্ষাও নতুন নিয়মে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
নেটওয়ার্ক কভারেজ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে পরীক্ষার যন্ত্র যে এলাকায় সবচেয়ে শক্তিশালী সিগন্যাল শনাক্ত করবে, সেটিকেই ভিত্তি হিসেবে ধরা হবে। এছাড়া সব অপারেটরের ক্ষেত্রে একই গন্তব্য সার্ভার ব্যবহার করে তথ্য আদান-প্রদানের বিলম্ব পরিমাপ করা হবে, যাতে ফলাফলের তুলনা আরও নির্ভুল হয়।
মহাসড়কে চলাচলকারী ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়নের জন্য পরীক্ষামূলক গাড়ির গতি বাড়ানো হয়েছে। আগে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৫০ কিলোমিটার গতিতে পরীক্ষা চালানো হলেও এখন মহাসড়ক ও দ্রুতগতির সড়কে ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত গতিতে পরীক্ষা করা যাবে। তবে অন্যান্য সড়কে আগের মতো ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার গতির সীমা বহাল থাকবে।
শুধু পরীক্ষার পদ্ধতি পরিবর্তনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না বিটিআরসি। ভবিষ্যতে আরও তথ্যনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও নিয়েছে সংস্থাটি। মোবাইল অপারেটরদের নিজস্ব নেটওয়ার্কের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় সেবার মান খারাপ, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা হবে। এরপর সেই এলাকাগুলোতে বিশেষ পরিদর্শনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়া একটি স্বতন্ত্র ওয়েবভিত্তিক ব্যবস্থা তৈরি করা হবে, যার মাধ্যমে কল ব্যর্থ হওয়া, আধুনিক ভয়েস সেবার সমস্যা এবং অন্যান্য ত্রুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত ও প্রতিবেদন আকারে পাওয়া যাবে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো, আগে নির্ধারিত রুটে সীমাবদ্ধ থেকে নেটওয়ার্ক পরীক্ষা করা হলেও এখন যেকোনো সময় গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা বিটিআরসির নিজস্ব সিদ্ধান্তে দেশের যে কোনো স্থানে সেবার মান যাচাই করা যাবে।
বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত দেশে মোবাইল গ্রাহকের সংখ্যা ১৮ কোটি ৮৬ লাখ। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহক ৮ কোটি ৬০ লাখ, রবির ৫ কোটি ৮২ লাখ, বাংলালিংকের ৩ কোটি ৭৮ লাখ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটকের গ্রাহক ৬৮ লাখের কিছু বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে স্মার্টফোন ব্যবহার এবং মোবাইলনির্ভর সেবার বিস্তারের কারণে শুধু গ্রাহক সংখ্যা বাড়লেই হবে না, সেবার মানও নিশ্চিত করতে হবে। বিটিআরসির নতুন এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে কল ড্রপ, দুর্বল সিগন্যাল এবং ধীরগতির ইন্টারনেটের মতো সমস্যাগুলো আরও কার্যকরভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। তবে এর প্রকৃত সুফল মিলবে তখনই, যখন পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মোবাইল অপারেটরদের প্রয়োজনীয় উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করা হবে এবং সেবার মান নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

