রাষ্ট্রপতির পদ থেকে কেউ বিদায় নিলে তার পরবর্তী জীবনযাপন ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা কী হবে, তা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। বাংলাদেশে এ বিষয়ে রয়েছে নির্দিষ্ট আইন। রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালন শেষে মেয়াদ পূর্ণ করা কিংবা নির্ধারিত সময় দায়িত্ব পালনের পর পদত্যাগ করা ব্যক্তির জন্য অবসরভাতা ও অন্যান্য সুবিধা আইনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বর্তমানে ‘রাষ্ট্রপতির অবসরভাতা, আনুতোষিক ও অন্যান্য সুবিধা আইন, ২০১৬’ অনুযায়ী সাবেক রাষ্ট্রপতিরা এসব সুবিধা পেয়ে থাকেন। এর আগে ১৯৭৯ সালের একটি সামরিক অধ্যাদেশের মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হলেও পরে সেটি বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়।
দায়িত্ব পালনের পর আমৃত্যু অবসরভাতা:
আইনের ৩ ধারায় বলা হয়েছে, কোনও ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হিসেবে কমপক্ষে ছয় মাস দায়িত্ব পালন করার পর পদত্যাগ করলে কিংবা মেয়াদ শেষ করলে তিনি আমৃত্যু অবসরভাতা পাওয়ার অধিকারী হবেন। সাবেক রাষ্ট্রপতির মাসিক অবসরভাতা নির্ধারণ করা হয় দায়িত্ব পালনকালে পাওয়া সর্বশেষ মূল বেতনের ৭৫ শতাংশ হারে।
বর্তমানে রাষ্ট্রপতির মাসিক মূল বেতন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সে হিসাবে একজন সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রতি মাসে ৯০ হাজার টাকা অবসরভাতা পাওয়ার যোগ্য।
এককালীন আনুতোষিক নেওয়ার সুযোগ:
আইনে সাবেক রাষ্ট্রপতিদের জন্য এককালীন আনুতোষিক গ্রহণের সুযোগও রাখা হয়েছে। কেউ চাইলে মাসিক অবসরভাতার পরিবর্তে এককালীন অর্থ নিতে পারেন।
এই অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় তিনি যত বছর রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই সময়ের ভিত্তিতে। দায়িত্ব পালনের প্রতি বছরের জন্য এক বছরের অবসরভাতার সমপরিমাণ অর্থ এককালীন আনুতোষিক হিসেবে পাওয়ার বিধান রয়েছে।
মৃত্যুর পর পরিবারের জন্য সুবিধা:
অবসরভাতা গ্রহণরত কোনও সাবেক রাষ্ট্রপতি মারা গেলে তার স্ত্রী বা স্বামীও বিশেষ পারিবারিক ভাতার সুবিধা পাওয়ার অধিকারী হন। আইন অনুযায়ী, স্বামী বা স্ত্রী সাবেক রাষ্ট্রপতির প্রাপ্য অবসরভাতার দুই-তৃতীয়াংশ হারে আমৃত্যু মাসিক ভাতা পেতে পারেন।
চিকিৎসা, কর্মী ও অন্যান্য সরকারি সুবিধা:
শুধু অবসরভাতাই নয়, সাবেক রাষ্ট্রপতিদের জন্য আরও কিছু সরকারি সুবিধার ব্যবস্থা রয়েছে। আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, তারা দাফতরিক ও ব্যক্তিগত কাজে সহায়তার জন্য একজন ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ) এবং একজন সহকারী কর্মী পাওয়ার সুযোগ পান। এ ছাড়া, একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সমমানের সরকারি চিকিৎসা সুবিধা তারা আজীবন পেয়ে থাকেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতিদের জন্য সরকারি খরচে সার্বক্ষণিক আবাসিক টেলিফোন সুবিধাও দেওয়া হয়। দেশের ভেতরে ভ্রমণের সময় সরকারি সার্কিট হাউস বা রেস্ট হাউসে বিনামূল্যে থাকার সুযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক সফরের ক্ষেত্রে তারা কূটনৈতিক পাসপোর্ট ব্যবহারের অধিকারী হন।
আইনে সাবেক রাষ্ট্রপতিদের সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও রাখা হয়েছে। ২০১৬ সালের আইনের ৬ ধারায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে কোনও সাবেক রাষ্ট্রপতি এসব সুবিধার অধিকারী হবেন না। সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি কোনও রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের মাধ্যমে পদ থেকে অপসারণ করা হয়, তাহলে তিনি অবসরভাতা বা অন্যান্য সরকারি সুবিধা পাবেন না।
এ ছাড়া, উচ্চ আদালতের রায়ে অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে ঘোষিত ব্যক্তি কিংবা নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে দণ্ডিত সাবেক রাষ্ট্রপতিও এই আইনের আওতায় কোনও সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদগুলোর একটি। তাই দায়িত্ব শেষ হওয়ার পরও একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির জন্য নির্দিষ্ট আর্থিক ও প্রশাসনিক সুবিধা রাখা হয়েছে। তবে এসব সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে আইনের নির্ধারিত শর্ত পূরণ করাই মূল বিষয়।

