ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের দ্রুত বিস্তার এবং এ খাত থেকে রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করছে সরকার। প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধন ছাড়া কোনো বিদেশি ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন প্রচার করতে পারবে না।
‘ক্রস-বর্ডার ডিজিটাল বাণিজ্য নীতিমালা, ২০২৬’–এর খসড়া প্রস্তুত করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। খসড়াটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে আগামী ৬ আগস্টের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মতামত চাওয়া হয়েছে।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন প্রচার করতে হলে বিদেশি ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানকে আগে ডিজিটাল বিজনেস আইডেনটিটি (ডিবিআইডি) নিবন্ধন নিতে হবে। একই সঙ্গে বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), কর এবং দেশের প্রচলিত অন্যান্য আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করতে হবে। শুধু বিজ্ঞাপন নয়, বিদেশি কোনো ডিজিটাল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে চাইলে তাদেরও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনের আওতায় আসতে হবে।
নীতিমালা কার্যকর হলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপন দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন নিয়ম প্রযোজ্য হবে। এর ফলে মেটা, গুগল, ইউটিউবসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মকে বাংলাদেশে বিজ্ঞাপন প্রচারের ক্ষেত্রে নিবন্ধন নিতে হতে পারে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ও আন্তসীমান্ত বাণিজ্যের পরিধি দ্রুত বাড়ছে। কিন্তু নির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় ও কার্যক্রম তদারকিতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বাণিজ্যসচিব মো. আতাউর রহমান খান জানান, খসড়া নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। অংশীজনদের মতামত নেওয়ার পর এটি চূড়ান্ত করা হবে এবং পরবর্তী ধাপে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
তিনি বলেন, ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজার বড় হলেও দীর্ঘদিন ধরে এ খাতের জন্য নির্দিষ্ট কাঠামো ছিল না। নতুন নীতিমালার মাধ্যমে খাতটিকে নিয়মের মধ্যে আনার পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্য রয়েছে। এর আগে মেটা, গুগল, অ্যামাজন ও নেটফ্লিক্সের মতো আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে ভ্যাট নিবন্ধন নিয়ে কর পরিশোধ শুরু করেছে। দেশে সরাসরি কার্যালয় না থাকলেও পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা ভ্যাট রিটার্ন জমা দিয়ে আসছে।
প্রস্তাবিত নীতিমালার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দেশের ডিজিটাল বাণিজ্যকে বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করা। পাশাপাশি ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো। খসড়ায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল মাধ্যমে রপ্তানি বাড়াতে উদ্যোক্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পণ্য ও সেবা সরবরাহের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিদেশি বাজার অনুসন্ধানে সহায়তা দেওয়া হবে।
ডিজিটাল মাধ্যমে অর্জিত রপ্তানি আয়কে প্রচলিত রপ্তানির মতো স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনা করা হবে। এছাড়া ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পার্সেলভিত্তিক রপ্তানি সহজ করতে বিশেষ নীতিসহায়তা ও বিমা সুবিধার প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
খসড়া নীতিমালায় ডিজিটাল মাধ্যমে নিষিদ্ধ পণ্য বা সেবার বিজ্ঞাপন প্রচারে নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া এমন কোনো বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না, যা ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করে, প্রতারণার সুযোগ তৈরি করে বা ডিজিটাল বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত করে।
নীতিমালায় অনলাইনে নকল, ভেজাল বা প্রতারণামূলক পণ্য বিক্রিও নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি অনলাইন জুয়া, লটারি, বেটিং এবং আমদানি-রপ্তানি নীতিতে নিষিদ্ধ পণ্য বা সেবার ডিজিটাল বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে।
খসড়ায় ব্যবসা থেকে ব্যবসা, ব্যবসা থেকে ভোক্তা এবং ব্যবসা-ভোক্তা-ব্যবসা ভিত্তিক ডিজিটাল আমদানির সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। অনলাইনে আমদানি করা পণ্যের মূল্যসীমা যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ বা পরিবর্তনের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে সমন্বয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা চালু এবং দেশের বিদ্যমান অর্থ লেনদেন ব্যবস্থার সঙ্গে বৈশ্বিক পেমেন্ট নেটওয়ার্কের সংযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ক্রেতা ও বিক্রেতার স্বার্থ রক্ষায় আন্তসীমান্ত এসক্রো সেবা চালুর প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি রপ্তানি আয় দেশে আনা এবং আমদানি ব্যয় পরিশোধ সহজ করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় অনলাইনে বিক্রি হওয়া পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে মূল্য ফেরত, পণ্য ফেরত এবং বিক্রয়োত্তর সেবা সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। পণ্য অর্ডারের সঙ্গে সরবরাহ করা পণ্যের মিল না থাকলে, পণ্য ত্রুটিপূর্ণ হলে বা নকল প্রমাণিত হলে বিক্রেতাকে তা ফেরত নিয়ে ক্রেতার অর্থ ফেরত দিতে হবে।
এ ছাড়া অনলাইন লেনদেনসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযোগ ব্যবস্থাকে আধুনিক করার পাশাপাশি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও রয়েছে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজারের সুনির্দিষ্ট সরকারি হিসাব না থাকলেও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী এ খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আয়ারল্যান্ডভিত্তিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেটসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাজারের আকার ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
বিজ্ঞাপন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হলে সরকারের কাছে এ খাতের প্রকৃত আকার ও রাজস্ব সম্ভাবনার পরিষ্কার চিত্র পাওয়া যাবে। পাশাপাশি ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা বাড়বে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই হবে না, বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে তা মানাতে কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যবস্থাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

