টানা আট দিনের ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। সরকারি প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা গেছে, পাঁচ জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ২১৩ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এসব সড়ক পুনর্বাসন ও টেকসইভাবে মেরামতের জন্য প্রায় ৩৭৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে বলে হিসাব করেছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ)। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো দ্রুত সচল রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের জন্য ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
সওজের ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি সড়ক বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন সড়ক সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মূল প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চলের পাঁচ জেলায়, তবে সংশ্লিষ্ট সড়ক বিভাগগুলোর আওতায় থাকা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের মোট দৈর্ঘ্য ২১২ দশমিক ৯৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৩৪ দশমিক ০৯ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৩২ দশমিক ৯৫ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ১৪৫ দশমিক ৯১ কিলোমিটার জেলা সড়ক রয়েছে। অর্থাৎ, মোট ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই জেলা সড়ক, যা স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনের জন্য দুই ধরনের পরিকল্পনা করেছে। স্বল্পমেয়াদি মেরামতকাজের জন্য ৪৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা এবং দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পুনর্নির্মাণের জন্য ৩৩২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি সংস্কার এমনভাবে করা হবে যাতে সড়ক তিন থেকে পাঁচ বছর ব্যবহারযোগ্য থাকে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি মেরামতের লক্ষ্য হবে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী অবকাঠামো নিশ্চিত করা।
‘বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির সারসংক্ষেপ’ শীর্ষক একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন গত সপ্তাহে সওজের প্রধান কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি সড়কের অবস্থা, সম্ভাব্য সংস্কার ব্যয় এবং প্রয়োজনীয় বরাদ্দের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহে আরেফীন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রক্রিয়া শেষে তা সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি আরও জানান, বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যান চলাচল সচল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারকাজ শুরু হয়েছে। নিজস্ব জনবল এবং ইট, বালু ও পাথরসহ প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে।
সওজের তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে চট্টগ্রাম দক্ষিণ সড়ক বিভাগ। দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও চন্দনাইশ এলাকায় বন্যার প্রভাবে সড়কের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এই বিভাগে মোট ৭৩ দশমিক ০৮ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১০ দশমিক ৫৫ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ১৭ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ৪৫ দশমিক ০৫ কিলোমিটার জেলা সড়ক। স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষতি হয়েছে বান্দরবান সড়ক বিভাগে। সেখানে ৫৬ দশমিক ৬৩ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ দশমিক ৭০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, শূন্য দশমিক ৩৫ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ৫৪ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার জেলা সড়ক রয়েছে। এছাড়া বন্যায় একটি কালভার্ট ও পাঁচটি সেতুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা পাহাড়ি অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে।
চট্টগ্রাম সড়ক বিভাগের আওতায় ৫২ দশমিক ৭৭ কিলোমিটার সড়কের ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে ১৯ দশমিক ৫০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৬ দশমিক ৩৫ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ২৬ দশমিক ৯২ কিলোমিটার জেলা সড়ক রয়েছে।
কক্সবাজার সড়ক বিভাগে ১৫ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে শূন্য দশমিক ৮৬ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৩ দশমিক ৪৪ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ১১ দশমিক ০৪ কিলোমিটার জেলা সড়ক রয়েছে।
খাগড়াছড়ি সড়ক বিভাগে ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এখানে ৫ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ৬ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার জেলা সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে রাঙামাটি সড়ক বিভাগে ৩ দশমিক ৩৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, শূন্য দশমিক ৩৩ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক এবং ১ দশমিক ৫৯ কিলোমিটার জেলা সড়ক রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবছর ভারী বর্ষণ ও আকস্মিক বন্যার কারণে একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে শুধু অস্থায়ী সংস্কার যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সড়ক নির্মাণে উন্নত নকশা, কার্যকর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, টেকসই নির্মাণসামগ্রী এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় প্রতি মৌসুমেই একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

