টানা বৃষ্টি ও বন্যায় দেশের ৪৩ জেলায় ব্যাপক ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত হিসাব অনুযায়ী, এতে প্রায় ৪৭৮ কোটি টাকার কৃষিপণ্য নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়েছেন ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি কৃষক। মৌসুমের শুরুতেই এমন বিপর্যয়ে অনেক কৃষক নতুন করে চাষাবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার কৃষক হানিফ চৌকিদার এ মৌসুমে ৫ দশমিক ২৬ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। চার মণ ধানের বীজ কিনে প্রায় ২২ হাজার টাকা ব্যয়ে বীজতলা তৈরি করেন। কিন্তু কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে বীজতলা প্রায় এক সপ্তাহ পানির নিচে থাকায় সব নষ্ট হয়ে যায়।
হানিফ বলেন, মৌসুমের শুরুতেই এত বড় ক্ষতির কথা কল্পনাও করেননি। এখন নতুন করে বীজতলা তৈরি করতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। সেই সক্ষমতা না থাকায় কিছু জমি অনাবাদি পড়ে যাওয়ার আশঙ্কাও করছেন তিনি।
একই ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছেন রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার কৃষক জগৎময় চাকমা। তিনি দুই বিঘা বা প্রায় ০ দশমিক ২৬৮ হেক্টর জমিতে ৮৭২টি পেঁপে গাছ লাগাতে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। টানা বৃষ্টিতে বাগান ডুবে যাওয়ার আগে প্রায় ২৩ হাজার কেজি পেঁপে উৎপাদনের আশা ছিল তার। জগৎময়ের ভাষ্য, পানি নেমে গেলেও গাছগুলো ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছে এবং ফল ঝরে পড়ছে। এতে তার প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করছেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত ভারী বর্ষণ ও বন্যার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় ১ লাখ ৩৪ হাজার টন ফসল নষ্ট হয়েছে। মোট ৮ লাখ ১৭ হাজার হেক্টর আবাদি জমির মধ্যে ২৪ হাজার ১৩৮ হেক্টর, অর্থাৎ প্রায় ৩ শতাংশ জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, কুমিল্লা, বরিশাল, খুলনা, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, মাগুরা, পটুয়াখালী, শরীয়তপুর ও সিলেটসহ মোট ৪৩টি জেলা।
ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের তালিকায় রয়েছে আউশ ধান, আমনের বীজতলা, বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, আদা, মরিচ, হলুদ, পেঁপে, তরমুজ, চীনাবাদাম, পাট, কলা, আখ, খরমুজ, ভুট্টা ও পান। এর মধ্যে ১২ হাজার ৭৮৩ হেক্টর আউশ ধান, ১ হাজার ৭৪৬ হেক্টর আমনের বীজতলা এবং প্রায় ৯ হাজার হেক্টর শাকসবজির জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পটুয়াখালী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আমানুল ইসলাম জানান, জেলায় প্রায় ২ লাখ আমন চাষির মধ্যে ২৩ হাজার কৃষক নিয়মিত প্রণোদনার আওতায় ৫ কেজি বীজ ও ৫ কেজি এমওপি সার পেয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক ক্ষতির পর এখন পর্যন্ত অতিরিক্ত কোনো সরকারি সহায়তা পৌঁছেনি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং বরাদ্দ এলেই তা বিতরণ করা হবে।
রাঙ্গামাটির কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানান, জেলার বাঘাইছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। সেখানে প্রায় ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ১১ হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুত সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল জানান, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত সাতটি জেলার কৃষকদের জন্য সরকার পুনর্বাসন সহায়তা অনুমোদন করেছে। জেলাগুলো হলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি। তার ভাষ্য, আউশ ধান ও রোপা আমনের বীজতলা হারানো প্রায় ৬৩ হাজার কৃষককে ইতোমধ্যে দেরিতে রোপণযোগ্য নাবি জাতের আমন বীজ দেওয়া হয়েছে। অন্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদেরও শীতকালীন ফসলের মৌসুম শুরুর আগেই সহায়তা দেওয়া হবে।
৪৩টি জেলায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য থাকলেও কেন মাত্র সাতটি জেলা পুনর্বাসনের আওতায় এসেছে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার সাধারণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জেলা এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলার মধ্যে পার্থক্য করে। তাই যেসব এলাকায় ক্ষতির মাত্রা বেশি, সেগুলোকে আগে সহায়তার আওতায় আনা হয়েছে। এর আগে ১১ জুলাই এক অনুষ্ঠানে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছিলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার তালিকা প্রস্তুতের কাজ করছে।
এদিকে কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খানের মতে, এ ক্ষয়ক্ষতি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা বা সামগ্রিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি নয়। তবে বাজারে অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি ও বাজার ব্যবস্থাপনা জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ঘরবাড়ি মেরামত, হাঁস-মুরগির খামার পুনর্গঠন এবং মাছের পুকুর সংস্কারে নগদ সহায়তা দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় এখন নতুন বীজতলা তৈরি, আমনের চারা রোপণ এবং শীতকালীন সবজি চাষের সুযোগ রয়েছে।

