দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা গত সাত বছরে প্রায় পাঁচ গুণ বেড়েছে। বর্তমানে এসব যানবাহনের সংখ্যা ৬০ থেকে ৮০ লাখের মধ্যে হতে পারে বলে বিভিন্ন সংস্থার ধারণা। তবে এখনো এ যানবাহনের জন্য কোনো চূড়ান্ত নীতিমালা বা নিবন্ধন ব্যবস্থা না থাকায় নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে সরকার।
সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নিবন্ধন, লাইসেন্স, চলাচলের উপযোগী সড়ক, নিরাপত্তা মান, ব্যাটারি ও চার্জিং স্টেশনের মানদণ্ড নির্ধারণ করে একটি নীতিমালা তৈরির কাজ চলছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের নেতৃত্বে এ নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও তা এখনো অনুমোদন পায়নি। ফলে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাস পরও এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (পরিবহন) মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যাচ্ছে না। একই ধরনের মন্তব্য করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও।
নীতিমালা না থাকায় সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে আইনি এখতিয়ার নিয়ে। বিদ্যমান আইন অনুযায়ী মোটরযানের নিবন্ধন ও চালকের লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব বিআরটিএর হলেও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার নীতিমালা তৈরি করছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। ফলে কোন সংস্থা নিবন্ধন দেবে এবং কীভাবে আইন প্রয়োগ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঠিক সরকারি হিসাবও নেই। বিআরটিএর কর্মকর্তাদের ধারণা, দেশে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ লাখ এবং রাজধানীতে ১৫ লাখের বেশি এ ধরনের যান চলাচল করছে। অন্যদিকে সিপিডির গবেষণায় প্রায় ৬০ লাখ ইলেকট্রিক থ্রি-হুইলারের তথ্য উঠে এসেছে, যার মাত্র ৫ শতাংশ নিবন্ধিত। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে আবার এই সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখে পৌঁছেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, এসব অটোরিকশার ৯০ শতাংশ দেশে তৈরি হলেও মোটর, কন্ট্রোলার ও চার্জারের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। প্রতিদিন এসব যান প্রায় ৭৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, যা দেশের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৫ শতাংশ। এছাড়া রাজধানীতে অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন সীমিত হলেও অবৈধ চার্জিং পয়েন্টের সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি, যার ফলে সরকার বছরে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে এখনো প্রধান সড়ক ও মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল দেখা যায়। ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০টি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে নীতিমালা না থাকায় স্থায়ী সমাধান সম্ভব হচ্ছে না।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। নীতিমালা কার্যকর হওয়ার আগেই নতুন অটোরিকশা উৎপাদন ও বাজারজাত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি নিরাপত্তা মান, কারিগরি বৈশিষ্ট্য, চলাচলের সড়ক, যানবাহনের সংখ্যা এবং মালিকানার সীমা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
এদিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনাও। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিভিন্ন ধরনের থ্রি-হুইলার দুর্ঘটনায় এক হাজার ৩৭৬ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া স্থানীয়ভাবে তৈরি বিভিন্ন তিন চাকার যানবাহনের দুর্ঘটনায় আরও ৪৮৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ ও কার্যকর তদারকির আওতায় না আনলে এবং নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো গড়ে না তুললে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও জটিল হয়ে উঠবে।

