বর্ষা এলেই ঢাকার পরিচিত চিত্র—অল্প বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় সড়ক, ডুবে যায় অলিগলি। কোথাও হাঁটুসমান পানি, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট। থমকে যায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ব্যবসা-বাণিজ্য, দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। অথচ রাজধানীর এই জলাবদ্ধতা কোনো নতুন সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এটি ঢাকার অন্যতম বড় নাগরিক সংকট হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
ঐতিহাসিক নথিপত্র ঘাঁটলেও ঢাকায় জলাবদ্ধতার সমস্যার উল্লেখ পাওয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার পর থেকেই শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার আগ থেকে এখন পর্যন্ত জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া হয়েছে একাধিক মহাপরিকল্পনা, কর্মপরিকল্পনা ও সমীক্ষা। কিন্তু বাস্তবতা হলো—এসব পরিকল্পনার অধিকাংশই রয়ে গেছে কাগজে-কলমে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৬৮ সালের প্রথম ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান থেকে শুরু করে ঢাকা ওয়াসার ২০১৫-৪০ মেয়াদি সর্বশেষ মহাপরিকল্পনা পর্যন্ত কোনো উদ্যোগই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে স্পষ্ট হয়, ঢাকার জলাবদ্ধতার মূল সমস্যা পরিকল্পনার অভাব নয়, বরং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা, সমন্বয়হীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।
ঢাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে গেছে। স্বাধীনতার পর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, পরে ঢাকা ওয়াসা এবং সর্বশেষ দুই সিটি করপোরেশন এই দায়িত্ব পেয়েছে। কিন্তু বারবার দায়িত্ব পরিবর্তনের ফলে তৈরি হয়েছে সমন্বয়ের ঘাটতি। হারিয়েছে আগের অভিজ্ঞতা ও ধারাবাহিকতা।
বর্তমানে ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনা, খাল রক্ষণাবেক্ষণ, পয়োনিষ্কাশন এবং ভূমি ব্যবহারের অনুমোদনের দায়িত্ব ভাগ হয়ে আছে সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও রাজউকের মধ্যে। ফলে কোনো সমস্যার ক্ষেত্রে এককভাবে দায় নেওয়ার প্রবণতা কম। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবের কারণে অনেক উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি।
হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের পথ:
ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ হলো শহরের প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ ধ্বংস হয়ে যাওয়া। একসময় যে খাল, জলাধার, নিচু জমি ও রিটেনশন পন্ড বৃষ্টির পানি ধারণ ও প্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত, সেগুলোর অনেকটাই দখল ও ভরাটের শিকার হয়েছে।
অনেক খালের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও বক্স কালভার্টের পানি চলাচলের পথ সংকুচিত হয়েছে। আবার অনেক জলাধার পরিণত হয়েছে আবাসিক বা বাণিজ্যিক স্থাপনায়। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত শহর থেকে বের হওয়ার স্বাভাবিক ব্যবস্থা আর আগের মতো নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। জনসংখ্যার চাপ বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে কংক্রিটের বিস্তার। কমেছে খোলা জায়গা ও মাটির পানি শোষণের ক্ষমতা। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যাচ্ছে বিভিন্ন এলাকায়।
জলাবদ্ধতার পেছনে নাগরিক অসচেতনতাও একটি বড় কারণ। খাল, ড্রেন ও নালা-নর্দমায় গৃহস্থালি বর্জ্য ফেলার কারণে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতিবছর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দ্রুত আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যাপ্ত নজরদারি ও জবাবদিহির ঘাটতিও সংকটকে দীর্ঘস্থায়ী করেছে।
শত কোটি টাকা ব্যয়েও মিলছে না স্থায়ী সমাধান:
গত কয়েক বছরে ঢাকার জলাবদ্ধতা কমাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কোথাও খাল পরিষ্কার করা হয়েছে, কোথাও ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব বিচ্ছিন্ন প্রকল্প দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারেনি।
কোনো এলাকায় খাল সংস্কারের পর আবার দখল হয়েছে, কোথাও সড়ক উঁচু করার ফলে আশপাশের নিচু এলাকার মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে। পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির সমন্বয় না থাকায় অনেক প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারেনি। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এ ধরনের অকার্যকর ব্যয় কমানো জরুরি। অতীতের ভুল পরিকল্পনার বোঝা বহন করে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা দূর করতে নতুন করে আরেকটি মহাপরিকল্পনার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বিদ্যমান পরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন। ২০১৫-৪০ মেয়াদি মহাপরিকল্পনা সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন করতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। এ জন্য দরকার একটি শক্তিশালী সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ। যার অধীনে ওয়াসা, দুই সিটি করপোরেশন, রাজউক এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে। একক জবাবদিহির কাঠামো ছাড়া দীর্ঘদিনের সমন্বয়হীনতা দূর করা কঠিন।
একই সঙ্গে খাল, জলাধার ও নিচু জমি রক্ষায় ধারাবাহিক উদ্যোগ নিতে হবে। বর্ষার আগে কয়েক দিনের পরিচ্ছন্নতা অভিযান দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এসব এলাকার আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় কঠোরতা আনতে হবে।
জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন। এতে অর্থ ব্যয়ের হিসাব যেমন স্পষ্ট হবে, তেমনি প্রকল্পের বাস্তব ফলাফলও যাচাই করা যাবে।
নাগরিকদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতামূলক কার্যক্রম। ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টির ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নগর অবকাঠামোর সক্ষমতাও নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে।
পাঁচ দশকে একাধিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে—সমস্যা সমাধানের জন্য শুধু পরিকল্পনা তৈরি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর সমন্বয় এবং কঠোর জবাবদিহি।
ঢাকার জলাবদ্ধতা শুধু একটি প্রকৌশলগত সমস্যা নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনা ও সুশাসনের বড় পরীক্ষা। রাজধানীকে বাসযোগ্য রাখতে হলে এই সংকট মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপের বিকল্প নেই।

