বিদেশে ভালো চাকরি, বেশি বেতন আর উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতিনিয়ত মানুষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে অনিশ্চয়তার পথে। দালালদের প্রলোভন, ভুয়া প্রতিশ্রুতি আর প্রতারণার জালে আটকে অনেকেই হারাচ্ছেন অর্থ, স্বাধীনতা এমনকি জীবনও। আজ ৩০ জুলাই বিশ্ব মানব পাচারবিরোধী দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য— ‘প্রতারণার ফাঁদে বন্দি’।
মানব পাচারের ভয়াবহতা তুলে ধরা এবং এর শিকার হওয়া মানুষের অধিকার রক্ষায় সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ২০১৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৩০ জুলাইকে আন্তর্জাতিক মানব পাচারবিরোধী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর থেকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালন করা হচ্ছে।
তবে মানব পাচারের প্রকৃত চিত্র এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর কত মানুষ পাচারের শিকার হচ্ছেন, তার নির্ভরযোগ্য কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখানো অনেক মানুষ শেষ পর্যন্ত বন্দি জীবন, নির্যাতন কিংবা জেল থেকে দেশে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।
রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রতিবছর ৭০ থেকে ৯০ হাজার মানুষ বিভিন্ন দেশের কারাগার বা আটককেন্দ্র থেকে বহিষ্কৃত হয়ে দেশে ফেরেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এভাবে সাড়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ দেশে ফিরেছেন।
অন্যদিকে অবৈধ পথে সাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টায় প্রতিবছর অন্তত ৫০০ বাংলাদেশির মৃত্যু হয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বেসরকারি সংস্থার তথ্য থেকে জানা যায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কারাগারেও এখনো আটক রয়েছেন শত শত বাংলাদেশি। পর্যায়ক্রমে তাদের অনেককেই দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।
ইউরোপের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কাজ করা সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশের চেষ্টাকারীদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই পথটি ‘সেন্ট্রাল মেডিটেরেনিয়ান রুট’ নামে পরিচিত।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এই পথ ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। তবে এই যাত্রা অনেকের জন্য ভয়াবহ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। সাগরপথে দুর্ঘটনার পাশাপাশি লিবিয়ায় নির্যাতন, অপহরণ, জিম্মি করে অর্থ আদায় এবং অমানবিক পরিবেশে আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। ইতালি কিংবা গ্রিসে পৌঁছানোর আগেই অনেককে আটক হতে হয়েছে। গত ছয় বছরে প্রায় ১৫ হাজার বাংলাদেশিকে লিবিয়া থেকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর সহযোগিতায় ইউরোপ যাওয়ার পথে বিপদে পড়া বাংলাদেশিদের নিয়মিত দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। বাংলাদেশ দূতাবাস এবং আইওএমের সহায়তায় গত ১৫ বছরে ইউরোপ যাওয়ার পথে আটক ও উদ্ধার হওয়া ৪৮ হাজার ৫৪৮ জন বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির গবেষণা বলছে, মানব পাচারকারীরা বাংলাদেশিদের ইউরোপে পাঠাতে তিনটি বড় রুট এবং ১৮টি ছোট রুট ব্যবহার করে। বড় রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূমধ্যসাগর, পূর্ব-মধ্যসাগর ও পশ্চিম-মধ্যসাগর। সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে রাশিয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশকেন্দ্রিক রুটও সক্রিয় হয়েছে।
চাকরির প্রলোভনে রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিরা:
রাশিয়ায় মানব পাচারের অভিযোগ নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তদন্তে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। মানবাধিকার সংস্থা ফরটিফাই রাইটস এবং ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হান্ডসের যৌথ তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশি নাগরিকদের রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে।
এ ঘটনায় বাংলাদেশিসহ নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভারত, কেনিয়া ও কয়েকটি আফ্রিকান দেশের নাগরিকদের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে প্রায় অর্ধশত বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে জাতিসংঘের একটি বিশেষ কমিটিও তদন্ত শুরু করেছে।
নিহত ও আহত বাংলাদেশিদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, দেশের কিছু এজেন্সি ও দালাল চক্র নিরাপত্তাকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, ওয়েল্ডার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা কারখানার চাকরির কথা বলে ৮ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়েছে। তাদের বৈধ ভিসায় রাশিয়ায় নেওয়া হলেও পরে রুশ ভাষায় লেখা এমন কিছু নথিতে স্বাক্ষর করানো হয়, যার অর্থ তারা বুঝতে পারেননি। এরপর সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান বন্ধে সরকার ‘মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। এতে একক ও সংঘবদ্ধ মানব পাচারের ঘটনায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং মৃত্যুদণ্ডের সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত মানব পাচারসংক্রান্ত মোট ৫ হাজার ২৮৪টি মামলা ঝুলে আছে। এর মধ্যে ১ হাজার ৯৭৮টি মামলা তদন্তাধীন এবং ৩ হাজার ৩০৬টি মামলা বিচারাধীন।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে নতুন মামলা হয়েছে ৫০০টি। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৭১টি, ফেব্রুয়ারিতে ৬৬টি, মার্চে ১১০টি, এপ্রিলে ১৩০টি এবং মে মাসে ১২৩টি মামলা হয়েছে। তবে একই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৭টি মামলা। চলতি বছর বা ২০২৫ সালে কোনো মামলায় বড় ধরনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির তথ্য পাওয়া যায়নি।
ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান বলেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই মানব পাচার বন্ধ হবে না। আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর মানব পাচার ও সাইবার প্রতারণা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পাচারের সঙ্গে জড়িত মূল অপরাধীদের বিচারের আওতায় এনে তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে।
মানব পাচারপ্রবণ এলাকাগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কার্যকর উদ্যোগ ছাড়া মানব পাচার, অর্থ পাচার ও মাদকের মতো আন্তঃসম্পর্কিত অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন যেন কারও জন্য প্রতারণার ফাঁদে পরিণত না হয়, সে জন্য প্রয়োজন সচেতনতা, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা।

