বিশ্বজুড়ে যখন দ্রুতগতির ইন্টারনেটকে কেন্দ্র করে নতুন অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠছে, তখন বাংলাদেশ এখনো ধীরগতির সংযোগের সমস্যায় আটকে রয়েছে। মোবাইল নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটলেও ইন্টারনেটের গতি, সেবার মান এবং ব্যবহারকারীর সংখ্যা—সব ক্ষেত্রেই প্রত্যাশা ও বাস্তবতার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। ফলে ডিজিটাল অর্থনীতি, অনলাইন ব্যবসা, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি সেবার আধুনিকায়নের পথও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, মোবাইল ইন্টারনেটের গতির দিক থেকে বিশ্বের ১০৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯১তম। অন্যদিকে ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের ক্ষেত্রে ১৪১টি দেশের মধ্যে অবস্থান ৯৩তম। অর্থাৎ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়লেও সেবার মান এবং গতি আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় এখনো অনেক পিছিয়ে।
বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ‘দি আনফিনিশড ডিজিটাল রেভল্যুশন: এক্সপান্ডিং ইন্টারনেট অ্যাকসেস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, আধুনিক বিশ্বে উচ্চগতির ইন্টারনেট কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি উৎপাদনশীলতা, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, উদ্ভাবন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাই শুধু ইন্টারনেট সংযোগ পৌঁছে দিলেই হবে না, সেই সংযোগ হতে হবে দ্রুত, স্থিতিশীল এবং সবার নাগালের মধ্যে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ফোরজি নেটওয়ার্ক দেশের শতভাগ জনগোষ্ঠীর আওতায় থাকলেও বাস্তবে ২০২৪ সালে মাত্র ৫৩ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ দেশের প্রায় ৪৭ শতাংশ মানুষ এখনো ইন্টারনেট ব্যবহারের বাইরে। এই পরিসংখ্যান দেখায়, নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটলেও ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এখনো পূর্ণতা পায়নি।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো স্মার্ট ডিভাইসের উচ্চ মূল্য, ডেটা প্যাকেজের ব্যয়, ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে সচেতনতার অভাব। ফলে অনেক মানুষ নেটওয়ার্ক সুবিধার আওতায় থাকলেও নিয়মিত ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন না।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর হার বেড়ে ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর হারও বেড়ে প্রায় ৮৯ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। তবে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়লেও সেবার মানে সেই উন্নতি এখনো দৃশ্যমান নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ধীরগতির ইন্টারনেট এখন দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমানে রপ্তানি, তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, ই-কমার্স, অনলাইন শিক্ষা, টেলিমেডিসিন এবং সরকারি ডিজিটাল সেবার বড় অংশই নির্ভর করছে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেটের ওপর। কিন্তু সংযোগ ধীর হলে কাজের গতি কমে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায় এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে।
বিশেষ করে সরকারের ক্যাশলেস সমাজ গড়ার পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও দ্রুতগতির ইন্টারনেট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল পেমেন্ট, মোবাইল আর্থিক সেবা, অনলাইন ব্যাংকিং, কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন এবং বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ—সবকিছুই নির্ভর করে স্থিতিশীল ইন্টারনেটের ওপর। সংযোগ দুর্বল হলে লেনদেন সম্পন্ন হতে দেরি হয়, অনেক সময় পেমেন্ট ব্যর্থ হয় কিংবা একই লেনদেন একাধিকবার সম্পন্ন হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। এতে গ্রাহক ও ব্যবসায়ী—উভয়ের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ব্যাংকিং খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট ছাড়া একটি কার্যকর ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। এ কারণেই বিকল্প প্রযুক্তির মাধ্যমে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন থাকলেও লেনদেন চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তৈরির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক তুলনাও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাত শীর্ষে রয়েছে, যেখানে গড় ডাউনলোড গতি সেকেন্ডে ৬৮১ মেগাবিট। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ ভিয়েতনামেও এই গতি প্রায় ১৮৮ মেগাবিট। অথচ বাংলাদেশের মোবাইল ইন্টারনেটের গড় গতি মাত্র ৪৩ মেগাবিট।
ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটেও একই চিত্র দেখা যায়। সিঙ্গাপুরে গড় গতি ৪২১ মেগাবিট হলেও বাংলাদেশে তা মাত্র ৬৬ মেগাবিট। ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলোও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় অনেক এগিয়ে রয়েছে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, গত সাত থেকে আট বছরে মোবাইল ইন্টারনেট অবকাঠামোতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। দেশে ফোরজি নেটওয়ার্ক থাকলেও এর মানোন্নয়ন তেমন হয়নি। অন্যদিকে প্রতিবেশী অনেক দেশ ইতোমধ্যে ফাইভজি প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে গেছে। ফলে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়ছে।
বিশ্বব্যাংক আরও বলেছে, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ৯৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। বিপরীতে নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এই হার মাত্র ২৩ শতাংশ। নিম্নমধ্যম আয়ের দেশগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল বৈষম্য।
বাংলাদেশেও সেই বৈষম্য স্পষ্ট। গ্রামীণ এলাকায় দুর্বল সংযোগ ও কম গতির কারণে মানুষ কৃষিসংক্রান্ত তথ্য, ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন স্বাস্থ্যসেবা, সরকারি সেবা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে শুধু প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যও আরও গভীর হচ্ছে।
প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের মতে, বর্তমানে উচ্চগতির ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট আর বিলাসিতা নয়; এটি বিদ্যুৎ, সড়ক কিংবা জ্বালানির মতোই একটি মৌলিক অবকাঠামো। ব্যবসা পরিচালনা, ক্লাউডভিত্তিক সেবা, গ্রাহক সহায়তা, সফটওয়্যার ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ—সব ক্ষেত্রেই শক্তিশালী ইন্টারনেট অপরিহার্য। সংযোগে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদনশীলতা কমে এবং ব্যবসার ব্যয়ও বেড়ে যায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতি দ্রুত ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশের রপ্তানিরও একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। তাই ইন্টারনেটের গতি ও নির্ভরযোগ্যতা উন্নত করা না গেলে ভবিষ্যতে বৈদেশিক বিনিয়োগ, প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
এদিকে সরকার উচ্চগতির ইন্টারনেট বিস্তারের লক্ষ্যে তৃতীয় সাবমেরিন কেবল, ফাইভজি অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং স্যাটেলাইটভিত্তিক উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা চালুর উদ্যোগ নিয়ে এগোচ্ছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহও বাড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নতুন প্রকল্প গ্রহণ করলেই হবে না; সাশ্রয়ী মূল্য, উন্নত অবকাঠামো, নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ এবং দক্ষ জনশক্তি নিশ্চিত করেই দেশের ডিজিটাল রূপান্তরকে টেকসই করতে হবে।
সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে, বাংলাদেশে ইন্টারনেটের বিস্তার ঘটলেও গতি ও মানের উন্নয়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। কারণ আগামী দিনের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়নের ভিত্তি নির্ভর করবে একটি দ্রুত, স্থিতিশীল ও সবার জন্য সহজলভ্য ইন্টারনেট ব্যবস্থার ওপর।

