দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক হিসেবে অবশেষে একজন ব্যবসায়ীকে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। ব্যবসায়ী সমাজের দীর্ঘদিনের দাবির পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জের পরিবেশবান্ধব তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক।
রোববার (২ আগস্ট) রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। দায়িত্ব নেওয়ার পর সংগঠনের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।
এর আগে গত ২৬ জুলাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মো. ফজলুল হককে ১২০ দিনের জন্য এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। এই সময়ের মধ্যে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করে নির্বাচিত ব্যবসায়ী নেতৃত্বের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করাই হবে তার প্রধান দায়িত্ব।
মো. ফজলুল হক দেশের তৈরি পোশাক খাতের একজন পরিচিত উদ্যোক্তা। তিনি এর আগে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছেন। ব্যবসায়ী সংগঠন পরিচালনায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকায় নতুন দায়িত্ব পালনে তিনি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবেন বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত ২৭ জুন সাবেক প্রশাসক মো. আবদুর রহিম খানের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর প্রায় দেড় মাস এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসকের পদ শূন্য ছিল। এ সময় ব্যবসায়ী মহলের একটি বড় অংশ সরকারি কর্মকর্তার পরিবর্তে বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ কোনো উদ্যোক্তাকে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল। শেষ পর্যন্ত সেই দাবির প্রেক্ষিতেই সরকার একজন ব্যবসায়ীকে প্রশাসকের দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বর্তমান পরিস্থিতির সূচনা হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর। সে সময় এফবিসিসিআইয়ের পরিচালনা পর্ষদের পুনর্গঠনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে এবং সংগঠনের সদস্যদের একাংশের দাবির মুখে তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম পদত্যাগ করেন। পরে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে প্রশাসক নিয়োগ দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। প্রথম প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পান বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের সদস্য মো. হাফিজুর রহমান।
তিনি প্রায় এক বছর দায়িত্ব পালন করলেও নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারেননি। যদিও তার মেয়াদকালে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল, বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালার কয়েকটি ধারা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে একাধিক রিট হওয়ায় নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়।
এরপর ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুর রহিম খান প্রশাসকের দায়িত্ব পান। তাকেও ১২০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আদালতে চলমান মামলার কারণে তিনিও সেই দায়িত্ব সম্পন্ন করতে পারেননি। পরে তার মেয়াদ আরও চার মাস বাড়ানো হলেও গত ২৬ জুন তা শেষ হয়।
দায়িত্ব গ্রহণের পর মো. ফজলুল হক বলেছেন, সরকার তাকে ১২০ দিনের মধ্যে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের দায়িত্ব দিয়েছে। তিনি সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন এবং এজন্য এফবিসিসিআইয়ের সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্পনীতি এবং সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের সংলাপে এফবিসিসিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই দীর্ঘদিন পর একজন অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী প্রশাসক দায়িত্ব পাওয়ায় সংগঠনটির কার্যক্রমে গতি ফিরতে পারে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন এবং নির্বাচিত নেতৃত্বের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করতে পারলেই এই নিয়োগের প্রকৃত সফলতা নির্ধারিত হবে।

