বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে একযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের কৌশল নিয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে চীনের নেতৃত্বে গঠিত আন্তর্জাতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থায় পর্যবেক্ষক সদস্য হিসেবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার এই সময়ে দুই বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত স্বার্থকে আরও শক্তিশালী করতে চাইছে।
শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত সের্জিও গরের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়ে বাংলাদেশের আগ্রহের কথা তুলে ধরেন। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং নতুন সহযোগিতার ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
একই দিনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা দেয়, চীনের সাংহাইভিত্তিক বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থায় পর্যবেক্ষক সদস্য হিসেবে যোগ দেবে বাংলাদেশ। চলতি বছরের ১৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত এই আন্তঃসরকারি সংস্থার সদস্য সংখ্যা বর্তমানে ২৯টি। সংস্থাটির লক্ষ্য হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা, ডিজিটাল বৈষম্য কমানো, উন্মুক্ত ও বৈষম্যহীন প্রযুক্তি পরিবেশ গড়ে তোলা এবং নিরাপদ ও দায়িত্বশীলভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিশ্চিত করা।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত সের্জিও গর তখনও ঢাকায় অবস্থান করছিলেন, ঠিক সেই সময়েই বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক সংস্থায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত প্রকাশ করে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্র ও প্রযুক্তি কৌশলেরই প্রতিফলন।
বৈঠক শেষে সের্জিও গর বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ প্যাক্স সিলিকা উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার সুযোগও পেতে পারে। এই উদ্যোগটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে চালু হয়। এর লক্ষ্য হলো অর্ধপরিবাহী প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদের সরবরাহব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা। বর্তমানে এতে ২৫টি দেশ যুক্ত রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে এবং বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আশাবাদী। সম্প্রতি বাংলাদেশ সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ সতর্কতা শিথিল করা হয়েছে, যা কেবল পর্যটকদের নয়, সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের কাছেও ইতিবাচক বার্তা দেবে বলে তিনি মনে করেন।
সের্জিও গর আরও জানান, আগামী সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের একটি বড় ব্যবসায়ী দল বাংলাদেশ সফরে আসবে। তাদের লক্ষ্য হবে তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ শিল্পসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে বিনিয়োগের সুযোগ পর্যালোচনা করা। তার ভাষায়, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ অনেক এবং দুই দেশ সেই সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগ্রহী।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদি আমিন জানান, আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে প্রায় ২৫টি শীর্ষ মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ৪৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করবে। এই সফরে তারা দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, শিল্প সম্ভাবনা এবং ব্যবসায়িক সুযোগ নিয়ে আলোচনা করবেন।
বৈঠকে দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার সহযোগিতায় বাংলাদেশে পুনরায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালুর বিষয়েও একমত হয়েছে। পাশাপাশি সয়াবিন, তুলা, গমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের সংরক্ষণাগার নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগেরও আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি খাত কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত গুরুত্বও বহন করে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ আকর্ষণের পাশাপাশি চীনের নেতৃত্বাধীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা কাঠামোতে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তবে এই কৌশল সফল করতে হলে প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি বজায় রেখে দুই পক্ষের সহযোগিতা কাজে লাগাতে পারলে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

