সরকার যখন সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং মিতব্যয়িতা নীতি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিচ্ছে, ঠিক সেই সময় বহুল আলোচিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধনের জন্যই ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সুবিধাভোগী পরিবার চিহ্নিত করা, তথ্য সংগ্রহ, স্মার্ট কার্ড তৈরি এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুলতে মোট ১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকার যে প্রস্তাব করা হয়েছে, তার মধ্যেই এই উদ্বোধনী ব্যয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকেই মনে করছেন, যখন সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে, তখন শুধু উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য এত বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ যৌক্তিক কি না, তা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে। সুশাসন নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থাও এ ব্যয়কে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বলে মন্তব্য করেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, ৫০ কোটি টাকা দিয়ে হাজারো দরিদ্র পরিবারকে সরাসরি সহায়তা করা সম্ভব। সেই অর্থ একটি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী আয়োজনের জন্য বরাদ্দ করা হলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তার ভাষায়, এটি এমন একটি ব্যয়, যেখানে আয়োজনের খরচই মূল কর্মসূচির চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেটে কোনো খাতে অর্থ বরাদ্দ থাকলেই পুরো অর্থ ব্যয় করা হবে—এমন নয়। প্রকল্প পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, ৫০ কোটি টাকার একটি সম্ভাব্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করা হবে।
জাতীয় বাজেটে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির জন্য ইতোমধ্যে ১৪ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি বিএনপির অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির একটি কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে এর প্রাথমিক বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
ঢাকার কড়াইল বস্তিতে পরিচালিত একটি পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে দেখা গেছে, প্রকৃত দরিদ্র পরিবারের অনেকেই কার্ড পাননি। অভিযোগ রয়েছে, তুলনামূলকভাবে সচ্ছল ব্যক্তি এমনকি বাড়ির মালিকদের কেউ কেউও তালিকায় স্থান পেয়েছেন। এতে উপকারভোগী নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সূত্র জানায়, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে সামাজিক সুরক্ষা জোরদার প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি ব্যয় কিছুটা কমানোর সুপারিশসহ সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করেছে।
চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এ কর্মসূচির জন্য আলাদা বরাদ্দ না থাকায় সমাজসেবা অধিদপ্তর দ্রুত অর্থ ছাড়ের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে গত ১৮ জুলাই সমাজকল্যাণ সচিবের কাছে ১ হাজার ৫১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ছাড়ের অনুরোধ জানানো হয়। পরদিন প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।
সংশোধিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরেই ৫৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে এনএফসি প্রযুক্তিসমৃদ্ধ স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড তৈরি ও বিতরণের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য ৬৬ হাজার ৮১৫টি ট্যাবলেট এবং পাঁচটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার কেনার জন্য ২২১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিভাগীয় পর্যায়ে সেমিনার আয়োজনের জন্য রাখা হয়েছে ৮০ লাখ টাকা।
তথ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও প্রশিক্ষণের জন্য ৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা এবং মাঠপর্যায়ে তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের যাতায়াত ব্যয়ের জন্য ৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে। দেশব্যাপী প্রকৃত উপকারভোগী শনাক্ত করতে প্রায় ৬০ হাজার তথ্যসংগ্রাহক নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। শুধু জরিপ, তথ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্যই ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৬৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ছিল ৯০৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা। পরে আলাদা প্রকল্পের পরিবর্তে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিকে একই কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করায় মোট ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৮১৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকায়। পরবর্তীতে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি ব্যয় পুনর্বিন্যাস করে ফ্যামিলি কার্ড বাস্তবায়নের ব্যয় ১ হাজার ৯০৯ কোটি টাকায় সীমিত রাখার সুপারিশ করে।
প্রকল্পের সম্প্রসারিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত তথ্যপ্রক্রিয়াকরণ সেবা, কম্পিউটিং সুবিধা এবং যানবাহন ব্যবহারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। কর্মকর্তাদের দাবি, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। গত অর্থবছরে সীমিত পরিসরে পরীক্ষামূলক বাস্তবায়নের পর এবার দেশব্যাপী সম্প্রসারণের প্রস্তুতি চলছে।
প্রকল্প পরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে প্রায় ৪১ লাখ মানুষের হাতে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ধাপে আরও সুবিধাভোগীকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সহযোগিতায় চলমান জরিপ আগস্টের মধ্যেই শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ে উপকারভোগী নির্বাচন নিয়ে ইতোমধ্যেই নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। সরকারি নীতিমালায় ভূমিহীন, প্রান্তিক এবং নারীপ্রধান পরিবারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে সেই নীতির যথাযথ অনুসরণ হচ্ছে না। প্রথম ধাপে ১৪টি জেলায় ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে কার্ড দেওয়া হলেও বিভিন্ন এলাকায় প্রকৃত দরিদ্ররা বাদ পড়ার অভিযোগ উঠেছে।
কড়াইল এলাকায় বসবাসকারী কয়েকজনের অভিযোগ, অনেক দরিদ্র পরিবার তালিকার বাইরে থেকে গেছে, অথচ তুলনামূলকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা কার্ড পেয়েছেন। এতে পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির মূল লক্ষ্য দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা। কিন্তু শুরুতেই যদি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং উপকারভোগী নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, তাহলে কর্মসূচিটির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের পাশাপাশি ব্যয়ের যৌক্তিকতা, স্বচ্ছতা এবং প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

