বাংলাদেশের রাজনীতিতে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সবচেয়ে আলোচিত বিদায়ের একটি ছিল অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগ। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন এবং ২০০১ সালের নির্বাচনের পর দলটির মনোনীত রাষ্ট্রপতি হলেও মাত্র সাত মাস সাত দিনের মাথায় তাকে দায়িত্ব ছাড়তে হয়। দলের সংসদ সদস্যদের অনাস্থা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধই শেষ পর্যন্ত তার বিদায়ের পথ তৈরি করে।
সংসদীয় দলে প্রকাশ্যে অনাস্থা
২০০২ সালের ১৯ ও ২০ জুন অনুষ্ঠিত বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক ছিল পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া মুহূর্ত। প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে একের পর এক সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতির কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করেন।
সভায় অংশ নেওয়া অনেক সংসদ সদস্য সরাসরি দাবি জানান, বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দিতে হবে। অন্যথায় তার বিরুদ্ধে অভিশংসন (ইমপিচমেন্ট) প্রক্রিয়া শুরু করারও হুমকি দেওয়া হয়।
পরদিন দেশের প্রায় সব সংবাদপত্রে বড় শিরোনামে প্রকাশিত হয় যে, বিএনপির সংসদ সদস্যরা নিজেদের মনোনীত রাষ্ট্রপতির ওপর আস্থা হারিয়েছেন।
দুটি বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ
সংসদীয় দলের আলোচনায় মূলত দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
প্রথমত, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার সমাধিতে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেননি রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক বাণীতে জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
তৎকালীন স্থানীয় সরকার উপমন্ত্রী রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এ বিষয়গুলো সভায় উত্থাপন করেন বলে সে সময়ের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বৈঠকে বক্তব্য দেওয়া অধিকাংশ সংসদ সদস্য একই ধরনের সমালোচনা করেন।
ছেলের কর্মকাণ্ড নিয়েও ওঠে প্রশ্ন
বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ছেলে ও বিএনপির সংসদ সদস্য মাহী বি. চৌধুরীর কর্মকাণ্ড নিয়েও আপত্তি তোলা হয়।
অভিযোগ ছিল, বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার মুন্সীগঞ্জ সফর উপলক্ষে তাকে স্বাগত জানিয়ে তোরণ নির্মাণ করেছিলেন মাহী বি. চৌধুরী। বিএনপির কয়েকজন সংসদ সদস্য এটিকে দলীয় অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন।
সে সময়ের একটি সংবাদ প্রতিবেদনে একজন সংসদ সদস্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, যদি সবাই এভাবে বিরোধীদলীয় নেতাদের জন্য তোরণ নির্মাণ শুরু করেন, তাহলে দলের অবস্থান কোথায় থাকবে?
পদত্যাগের আহ্বান
২০ জুন বৈঠক শেষে সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের আহ্বান জানানো হয়।
তৎকালীন চিফ হুইপ খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বঙ্গভবনে পাঠানো হয়। সেখানে বলা হয়, বিএনপি সংসদীয় দল রাষ্ট্রপতির ওপর আস্থা হারিয়েছে এবং তাকে অবিলম্বে দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।
এরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর গুঞ্জন শুরু হয় যে রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন।
ছেলে বাবাকে কী বলেছিলেন
সংসদীয় দলের বৈঠক চলাকালে মাহী বি. চৌধুরী সভা থেকে বেরিয়ে ফোনে বাবাকে বৈঠকের পরিস্থিতি জানান।
সে সময়ের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিনি বাবাকে বলেন, দলের ভেতরে তার পক্ষে কথা বলার মতো কেউ নেই, তাই পদত্যাগ করাই ভালো হবে।
অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতি দলের বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন এবং সেই ভুল ক্ষমার অযোগ্য।
যেসব অভিযোগ সামনে আনা হয়েছিল
বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিরুদ্ধে শুধু দুটি অভিযোগই নয়, আরও বেশ কয়েকটি বিষয় সামনে আনা হয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল—
- জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে তার সমাধিতে না যাওয়া।
- রাষ্ট্রপতির বাণীতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ না করা।
- মাহী বি. চৌধুরীর মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানিয়ে তোরণ নির্মাণ।
- বিভিন্ন বক্তব্যে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ শব্দবন্ধ ব্যবহার না করা।
- পাবলিক সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগসংক্রান্ত একটি ফাইলে স্বাক্ষর না করা।
- রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি অতিরিক্ত বাড়িয়ে তোলার অভিযোগ।
- চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজ না নেওয়া।
- দল মনোনীত রাষ্ট্রপতি হলেও নিরপেক্ষ অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করা।
- রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা ব্যয় বৃদ্ধি।
- সরকারের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে আপত্তি বা ভিন্নমত প্রকাশ।
- রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের বাইরে বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানে ঘন ঘন অংশগ্রহণ।
- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন, যা সরকারের একটি অংশ ভালোভাবে নেয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান নিয়েও অসন্তোষ
২০০৬ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সমাবর্তনে আমন্ত্রণ জানায় এবং তিনি সেখানে যোগ দেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরে একজন মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর কথা উল্লেখ করে তাকে বলেন, তিনি যেন এত বেশি জনসমক্ষে না আসেন এবং এ ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ কমিয়ে দেন।

বিএনপি নেতাদের কড়া প্রতিক্রিয়া
তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান অভিযোগ করেন, বদরুদ্দোজা চৌধুরী জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, তাকে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়তেই হবে, না হলে অন্য ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিএনপির আরেক নেতা আব্দুল মতিন চৌধুরী মন্তব্য করেন, শুরু থেকেই তিনি বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি করার বিরোধিতা করেছিলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং যোগাযোগমন্ত্রী নাজমুল হুদাও সে সময় রাষ্ট্রপতির সমালোচনায় সরব ছিলেন।
পদত্যাগের পর যা বলেছিলেন
বঙ্গভবন ছাড়ার পর বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, সরকারের সঙ্গে তার দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা জানতে কেউ তার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রীকে দুবার ফোন করলেও কথা হয়নি। তার মতে, অন্তত একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীকে প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য পাঠানো যেত।
তিনি আরও বলেন, বিএনপির সংসদীয় দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি পদত্যাগ করেছেন। যদিও সাংবিধানিকভাবে তিনি পদত্যাগ না করলে সংসদে অভিশংসনের মাধ্যমে তাকে সরানো সহজ হতো না।
তার দাবি ছিল, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দলীয় নয়, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন।

‘আমি দলের বিরুদ্ধে কাজ করিনি’
২০০৬ সালে সূত্রকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, তিনি নির্বাচনের আগেই দলীয় পদ ছেড়ে দিয়েছিলেন। ফলে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ না করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিজের বাণীতে তিনি জিয়াউর রহমানের ঐতিহাসিক ভূমিকার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছিলেন। তার মতে, একই বিষয় বারবার একই ভাষায় উল্লেখ করার প্রয়োজন ছিল না।
রাষ্ট্রপতি করতে প্রথমে অনাগ্রহ
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবউদ্দিন আহমেদকে আরও ছয় মাস দায়িত্বে রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে সে সময়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তিনি তাতে রাজি না হওয়ায় নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
প্রথমদিকে বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হলেও তিনি রাষ্ট্রপতি হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং সে সময়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, খালেদা জিয়া শুরুতে তাকে রাষ্ট্রপতি করার পক্ষে ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত উপযুক্ত বিকল্প না থাকায় তাকেই মনোনয়ন দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন— বিএনপির একটি অংশের এমন অভিযোগও তখন সামনে আসে।
পরবর্তীতে তার পদত্যাগের পর দেওয়া বক্তব্যে খালেদা জিয়াও ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় বলেন, যে যত বড়ই হোক, ষড়যন্ত্র করে কেউ পার পাবে না এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাঁর ভাষায়, ‘তাদের শেকড় কেটে দেওয়া হয়েছে।’

