বিশ্ব পরিস্থিতি যেভাবেই পরিবর্তিত হোক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার থেকে চীন সরে আসবে না বলে জানিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, চীন সব সময় বাংলাদেশের বিশ্বস্ত বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে পাশে থাকবে।
সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘কম্পারেটিভ গভর্নেন্স ফোরাম ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গঠনের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক বিদ্যমান সহযোগিতার কাঠামো অতিক্রম করে নতুন কৌশলগত উচ্চতায় পৌঁছেছে।
তিনি বলেন, চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ওই সফরে দুই দেশের নেতারা বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বে আরও উন্নীত করার পাশাপাশি ‘নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের বাংলাদেশ-চীন কমিউনিটি’ গঠনের ঘোষণা দেন।
একই সঙ্গে শাসনব্যবস্থা ও জনপ্রশাসনের অভিজ্ঞতা বিনিময় আরও জোরদারের বিষয়েও উভয় পক্ষ একমত হয়।
চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, এই নতুন অধ্যায় আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের স্বর্ণালি ভবিষ্যতের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে। দুই দেশ উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বাস্তবায়ন এবং উন্নয়ন কৌশলের সমন্বয় আরও জোরদারে একমত হয়েছে। পাশাপাশি তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক করিডোরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা হয়েছে।
তার মতে, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে দুই দেশের বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হবে এবং উচ্চতর পর্যায়ে উন্নীত হবে।
ইয়াও ওয়েন বলেন, তুলনামূলক শাসনব্যবস্থা নিয়ে এই ফোরাম বাংলাদেশ ও চীনের প্রথম যৌথ উদ্যোগ। দুই দেশের নিজস্ব শাসনব্যবস্থা, উন্নয়ন অভিজ্ঞতা ও মডেল নিয়ে আলোচনা এবং অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পারস্পরিক শিক্ষা ও সহযোগিতা বাড়ানোই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকার জনগণকেন্দ্রিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে কার্যকর ও বাস্তবমুখী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। তবে রাজনৈতিক ঐক্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, একক শিল্পনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসা এবং আরও অনুকূল আন্তর্জাতিক পরিবেশ সৃষ্টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
রাষ্ট্রদূত জানান, এসব বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে চীনের জাতীয় শাসনব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, দারিদ্র্য বিমোচন, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, চারটি বৈশ্বিক উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে অংশগ্রহণকারীরা পদ্মা সেতু ও দাশেরকান্দি পয়ঃশোধনাগার পরিদর্শনের সুযোগ পাবেন, যাতে বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার বাস্তব ফলাফল সরেজমিনে দেখতে পারেন। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও চীনের বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে উন্নয়ন পরিকল্পনা, শাসনব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময়ের সুযোগও থাকবে।
চীনা একটি প্রবাদ উদ্ধৃত করে ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘যাদের হৃদয়ের বন্ধন দৃঢ়, তাদের সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হয়।’ তার মতে, শাসনব্যবস্থা নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় দুই দেশের সেই বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করবে। তিনি অংশগ্রহণকারীদের চীনের আধুনিকায়নের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নের পথ অনুসন্ধানের আহ্বান জানান।
বক্তব্যের শেষে রাষ্ট্রদূত বলেন, এই ফোরামে শিক্ষাবিদ, গবেষক, সরকারি কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অংশ নিয়েছেন। তাদের পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতাকে আরও গভীর করবে এবং দুই দেশের জনগণের জন্য আরও বেশি সুফল বয়ে আনবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

