দুই বছর আগে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বিকেলে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে জড়ো হয়েছিল লাখো মানুষ। ওই সমাবেশ থেকেই তৎকালীন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেন।
তার আহ্বানে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ব্যাপকভাবে সাড়া দেয়। এর মাত্র দুই দিন পর, ৫ আগস্ট, দেড় দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। দীর্ঘদিনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানের পর তরুণ প্রজন্মসহ দেশের মানুষের মধ্যে একটি নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা তৈরি হয়। এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা হয় যেখানে বৈষম্য কমবে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সর্বোপরি সুশাসন নিশ্চিত হবে।
তবে বিশ্লেষক ও আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকের মতে, তরুণরা রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন করতে সক্ষম হলেও রাষ্ট্র কাঠামোর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে এখনো সফল হয়নি।
শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার আরেক দেশ নেপালেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। মাত্র ১০ মাস আগে সেখানে তরুণদের আন্দোলনের মুখে সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। এরপর জেন-জি সমর্থিত একজন র্যাপার বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে নতুন সরকারের নেতৃত্বে আসেন। কিন্তু সম্প্রতি সেই সরকারের বিরুদ্ধেই আবার শত শত তরুণ রাস্তায় নেমেছেন। কারণ রাষ্ট্র পুনর্গঠন নিয়ে তারা যে প্রত্যাশা করেছিলেন, বাস্তবে তার খুব সামান্যই প্রতিফলন দেখতে পাচ্ছেন।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এরিকা চেনোওয়েথ মনে করেন, জেন-জি প্রজন্মের এসব আন্দোলনের বড় বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর। ফলে প্রথাগত আন্দোলনের মতো এগুলোর গভীর সাংগঠনিক ভিত্তি তৈরি হয় না এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন আনতেও এসব আন্দোলন অনেক সময় ব্যর্থ হয়।
তার মতে, ১৯৮০-এর দশকে পোল্যান্ডের ‘সলিডারিটি’ আন্দোলন কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলন দীর্ঘ সময় ধরে তৃণমূল পর্যায়ের সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর ‘লিডারলেস’ বা নেতৃত্বহীন আন্দোলনগুলোতে সেই প্রাতিষ্ঠানিক গভীরতার অভাব স্পষ্ট।
এরিকা চেনোওয়েথের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশক থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী বিপ্লবী অহিংস আন্দোলনের সাফল্যের হার ছিল ৪০ শতাংশের বেশি। তবে ২০১০ সালের পর অহিংস আন্দোলনের সফলতার হার ৩৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে এবং সহিংস আন্দোলনের সফলতার হার মাত্র ৮ শতাংশ।
২০১০-১১ সালের আরব বসন্তও তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার একটি বড় উদাহরণ। সে সময় তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ব্যাপক গণবিক্ষোভকে ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ দেশেই এসব আন্দোলন রাষ্ট্র কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেনি। আরব বসন্তের একমাত্র সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত তিউনিসিয়াও পরে আবার কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার দিকে ফিরে যায়।
বাংলাদেশের ২০২৪ সালের আন্দোলনের সূচনাও হয়েছিল কোটা সংস্কারের দাবিকে কেন্দ্র করে। ওই বছরের ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও ছাত্রলীগের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সংঘর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ (২৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এক পুলিশ সদস্যকে আবু সাঈদকে লক্ষ্য করে গুলি করতে দেখা যায়। ওই ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হন এবং তা পরিণত হয় সরকার পতনের এক বৃহৎ বিক্ষোভে। এই আন্দোলনের মূল নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের বড় অংশই ছিলেন জেনারেশন জেড বা জেন-জি প্রজন্মের।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। এই সরকারে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া জেন-জি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ও সমর্থন ছিল।
তবে সরকার গঠনের পরপরই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয় তারা। একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য নির্ধারণের পরিবর্তে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রত্যাশা অনুযায়ী ছোট ছোট পরিবর্তনের উদ্যোগ দেখা যায়।
দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি দূর করার ক্ষেত্রেও অন্তর্বর্তী সরকার কাঙ্ক্ষিত সফলতা দেখাতে পারেনি বলে সমালোচনা রয়েছে। রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্যে ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হলেও শেষ পর্যন্ত সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী একটি সংস্কার কাঠামো রেখে যেতে পারেনি এই কমিশন।
জিওপলিটিকস স্ট্র্যাটেজি ল্যাবের (ফ্রান্স) প্রধান ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীন বলেন, তরুণরা সরকার পরিবর্তনে সক্ষম হলেও আন্দোলন-পরবর্তী নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্র সংস্কার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। এর প্রধান কারণ তরুণদের অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার ঘাটতি।
তিনি বলেন, তরুণদের সততা বা আত্মত্যাগ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে বয়সজনিত অভিজ্ঞতার সীমাবদ্ধতার কারণে তারা এ ধরনের বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।
ড. সাজ্জাদ মোহাম্মদ জসীমউদ্দীনের মতে, আন্দোলনের পর তরুণদের অন্যতম বড় দুর্বলতা ছিল সঠিক ও অভিজ্ঞ দিকনির্দেশক নির্বাচন করতে না পারা এবং যোগ্য মেন্টরদের পরামর্শ যথাযথভাবে গ্রহণ না করা।
তিনি মনে করেন, তরুণদের সরলতা ও আবেগকে কাজে লাগিয়ে কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ও সুবিধাবাদী গোষ্ঠী নিজেদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছে এবং এর মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সরকারি নিপীড়নের মুখে শিক্ষার্থী আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন শিক্ষক ও অভিভাবকদের একটি বড় অংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজীমউদ্দিন খানও ছিলেন তাদের একজন।
তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ রাষ্ট্রের ইতিহাস ঔপনিবেশিক হওয়ায় আমলাতন্ত্র জটিল কাঠামোর মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রভাব ধরে রেখেছে। ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ এখানে প্রায় সর্বজনীন একটি বিষয়।
তার মতে, তরুণদের নেতৃত্বাধীন অভ্যুত্থানের বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এসব আন্দোলনের পেছনে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট ও সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি থাকে না। প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি অনাস্থা থেকেই নতুন প্রজন্ম কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই নির্দিষ্ট ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজপথে আসে।
তিনি বলেন, আন্দোলনে যুক্ত মানুষের অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা অনেক ক্ষেত্রে একই রকম হলেও সুসংগঠিত রাজনৈতিক শক্তির অভাবে শেষ পর্যন্ত অভ্যুত্থানের সুফল পুরোপুরি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে।
অনেকের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাবও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কার্যক্রমকে জটিল করে তুলেছে।
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ভূঞা বলেন, বিশ্বের খুব কমসংখ্যক বিপ্লব বা অভ্যুত্থানই পূর্ণাঙ্গ সফলতা পেয়েছে। বাংলাদেশেও অভ্যুত্থানের পর সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থেকেই পরিবর্তন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
তিনি বলেন, একটি পক্ষ আগে রাষ্ট্র সংস্কার সম্পন্ন করে সেই ভিত্তিতে নির্বাচন আয়োজনের পক্ষে ছিল। অন্য পক্ষের অবস্থান ছিল, সংস্কারের দায়িত্ব নির্বাচিত সংসদ ও সরকারের ওপর থাকা উচিত, তাই দ্রুত নির্বাচন প্রয়োজন।
মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ভূঞার মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে হলে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আলোকে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল ও জোট গঠন একটি সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে।
জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বড় একটি অংশ পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে রাজনৈতিক দল গঠন করে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে তারা ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়। জোটবদ্ধ নির্বাচনে এনসিপি ছয়টি আসনে জয় পায়।
এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ মনে করেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংস্কারে প্রত্যাশিত সাফল্য কম দেখা গেলেও রাষ্ট্র পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে শুধু সরকার পরিবর্তন হয়নি, শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে। ১৫ বছরের অব্যবস্থাপনার পর রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরায় কার্যকর করতে সময় প্রয়োজন।
তার দাবি, জনগণ ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছে, মানবাধিকার সুরক্ষা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দেশ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
তবে রাষ্ট্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেছেন আলাউদ্দীন মোহাম্মদ।
তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্য এখনো সীমিত কিছু ক্ষেত্রেই অর্জিত হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধিতার কারণে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
তার ভাষ্য, বড় পরিসরে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো, অনেক ক্ষেত্রে জনগণের আকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব স্বার্থের কাছে উপেক্ষিত হয়েছে।
তবে তিনি মনে করেন, রাষ্ট্র সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বর্তমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই।
জুলাই অভ্যুত্থানে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবিরসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনেরও ভূমিকা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) জিএস এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এসএম ফরহাদ মনে করেন, গণ-অভ্যুত্থানের লক্ষ্য শুধু একটি সরকারের পতন ছিল না।
তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে ভবিষ্যতে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দল আবার কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে না পারে।
এসএম ফরহাদের মতে, প্রত্যাশিত পরিবর্তন পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হলেও অন্তত একটি ন্যূনতম সংস্কার কাঠামো সামনে এসেছে। জুলাই সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও ভারসাম্যপূর্ণ করার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব জনগণের সমর্থন পেয়েছিল।
তবে তার অভিযোগ, বাস্তবে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর জনগণের সমর্থন পাওয়া এসব মৌলিক সুপারিশ কার্যকর হয়নি এবং বিষয়গুলো বারবার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, সংবিধানের মূল নীতি অনুযায়ী রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ হলেও গণভোটে সমর্থিত বিষয়গুলো উপেক্ষা করা হয়েছে।
এসএম ফরহাদ আরও বলেন, বিচার বিভাগ, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, ব্যাংক খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর পরিবর্তে পুরোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামোই বহাল রয়েছে।
তার মতে, এর ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আর এ কারণেই গণ-অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা—রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে কর্তৃত্ববাদমুক্ত করা—এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
অভ্যুত্থান-পরবর্তী নির্বাচনের পর দেশ এখন সুশাসন ও জবাবদিহির পথে এগিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মূল কারণ ছিল দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে মানুষের ভোটাধিকার হরণ, রাজনৈতিক নিপীড়ন ও বঞ্চনা। এই ক্ষোভ থেকেই তরুণরা রাজপথে নেমেছিল এবং নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়েছিল।
তার ভাষ্য, ২০২৬ সালে দেশে একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের পছন্দের সরকার এবং কার্যকর সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। জুলাই সনদের সব লক্ষ্য এখনো বাস্তবায়িত হয়নি কিংবা সংস্কার শতভাগ সম্পন্ন হয়নি—এমন সমালোচনা থাকলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন, ধীরে ধীরে এসব বাস্তবায়ন হবে।
রাষ্ট্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন প্রসঙ্গে নাছির উদ্দীন নাছির বলেন, আমলাতন্ত্রের অতিমাত্রায় প্রভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি রাষ্ট্র পরিচালনায় আমলাতন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো প্রয়োজন।
তার মতে, বিগত ১৭ বছরে প্রকৃত অর্থে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতির কারণে আমলাতন্ত্রের প্রভাব বেড়েছিল। তবে বর্তমানে একটি শক্তিশালী নির্বাচিত সংসদ এবং কার্যকর বিরোধী দল থাকায় ধীরে ধীরে সেই প্রভাব কমে আসবে।
তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া তরুণদের স্বপ্ন, আশা ও আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথেই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার জেন-জি আন্দোলনের সঙ্গে আরব বসন্তেরও মিল খুঁজে পান অনেক বিশ্লেষক। সেখানেও তরুণদের নেতৃত্বে ব্যাপক আন্দোলন হয়েছিল। আরব বসন্তের সূতিকাগার ছিল উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়া।
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি দীর্ঘ ২৩ বছর ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট জয়নেল আবেদিন বেন আলি ক্ষমতাচ্যুত হন।
তবে তিউনিসিয়ায় অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতেই বিতর্কের মুখে পড়ে। কারণ, সেখানে আগের প্রশাসনের সুবিধাভোগীদের উপস্থিতি ছিল। পাশাপাশি অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সরকার উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেনি।
তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ধর্মনিরপেক্ষ ও ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ ক্রমেই তীব্র হয়েছে। এসব কারণে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা গেলে তরুণদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলন থেকেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
ব্যাংককের চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জানজিরা সোম্বাতপুনসিরি মনে করেন, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর না করে নাগরিক সমাজ, মূলধারার রাজনৈতিক দল এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিগুলোর সঙ্গে একটি বিস্তৃত জোট গঠন করা গেলে রাষ্ট্রে গভীর সংস্কার সম্ভব।
এ ধরনের সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে থাইল্যান্ড ও শ্রীলংকার কথা উল্লেখ করা হয়।
থাইল্যান্ডে দেড় দশক আগে বিভিন্ন সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করা তরুণ নেতৃত্ব পরবর্তী সময়ে কয়েক ধাপে ‘পিপলস পার্টি’ নামে একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল গঠন করে। ২০২৩ সালের নির্বাচনে দলটি সবচেয়ে বেশি আসন লাভ করে। ব্যাংককের মেট্রোপলিটন এলাকাতেও দলটির উল্লেখযোগ্য প্রভাব তৈরি হয়েছে।
একইভাবে শ্রীলংকায় ২০২২ সালের ব্যাপক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার উৎখাত হয়। এরপর ২০২৪ সালের নির্বাচনে ভোটাররা বামপন্থী দল ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ারের (এনপিপি) নেতা অনুরা কুমারা দিসানায়েককে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকলেও তার সরকার রাষ্ট্রে সংস্কার আনার উদ্যোগ নিয়েছে।
জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, বাংলাদেশে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের মূল এজেন্ডায় রাষ্ট্র সংস্কার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
তিনি বলেন, অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিরা মানুষকে সংগঠিত করার পর্যাপ্ত সুযোগ পাননি। মানুষ মূলত একটি অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে এবং সেই শাসনের অবসানের উদ্দেশ্যে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল।
তার মতে, এরপর সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও বিশেষ কর্মসূচির প্রয়োজন ছিল। এজন্য মানুষকে সচেতন ও সংগঠিত করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানের পর সে ধরনের উদ্যোগ দেখা যায়নি।
ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে হলে দেশের সর্বস্তরে সংগঠন থাকা প্রয়োজন, যেখান থেকে দাবি তৈরি হবে এবং সেই দাবির ভিত্তিতেই রাষ্ট্রে পরিবর্তন আসবে।
সূত্র: বণিক বার্তার প্রতিবেদন অবলম্বনে পুনর্লিখিত

