দেশে গুমের মতো গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের আলোচনার পর ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। নতুন এই আইনে গুমকে একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং অপরাধের ধরন অনুযায়ী সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড, এমনকি বিশেষ পরিস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
সোমবার (০৩ আগস্ট) বিকেলে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নতুন আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়।
নতুন আইনের মূল লক্ষ্য শুধু অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া নয়, বরং গুমের মতো মানবাধিকারবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধ, দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের অধিকার নিশ্চিত করা। এ আইনে গুমকে এমন একটি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে, যা আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য এবং আপস-অযোগ্য। অর্থাৎ এ ধরনের অভিযোগকে আর সাধারণ অপরাধের মতো বিবেচনা করা হবে না; বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেই এর তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকবে।
আইনে ভুক্তভোগীদের অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান, তদন্তের অগ্রগতি এবং ঘটনার প্রকৃত তথ্য জানার অধিকার পরিবারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদি দোষী ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হয়, তাহলে রাষ্ট্র সেই ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে।
গুমের ঘটনায় তদন্ত ও বিচার দ্রুত শেষ করার বিষয়েও নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করতে হবে এবং পরবর্তী সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকার্য শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়া কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে এই সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন আইনে প্রযুক্তিনির্ভর প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতাও নিশ্চিত করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতেও বিচার পরিচালনা, ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ গ্রহণ, সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা ও পরিচয় গোপন রাখার মতো বিষয়গুলোও এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এছাড়া গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার বিষয়েও বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে। গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজনীয় ভরণপোষণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। কোনো ব্যক্তি পাঁচ বছর পার হওয়ার পরও জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার না হলে উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য গুমের সনদ দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার গঠন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমেও গুমসংক্রান্ত তদন্ত এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
শাস্তির ক্ষেত্রে নতুন আইন আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। সাধারণভাবে গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে গুমের কারণে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটলে, মরদেহ উদ্ধার হলে কিংবা পাঁচ বছর অতিক্রমের পরও তাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া না গেলে আদালত মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড দিতে পারবেন।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশে মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এই আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে আইন প্রণয়নই চূড়ান্ত সমাধান নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়ন, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত বিচার নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। যদি এসব বিষয় বাস্তবে নিশ্চিত করা যায়, তাহলে গুমের মতো গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও আরও শক্তিশালী হতে পারে।

