বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস বহর সম্প্রসারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে এগোচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে শুধুমাত্র বোয়িং উড়োজাহাজ পরিচালনার পর এবার প্রথমবারের মতো ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসের উড়োজাহাজও যুক্ত হতে পারে বিমানের বহরে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে এয়ারবাসের সঙ্গে ১০টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সম্পন্ন করতে চায় বিমান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত ফার্নবরো আন্তর্জাতিক বিমান প্রদর্শনীতে এয়ারবাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস আনুষ্ঠানিকভাবে এয়ারবাসকে একটি চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করার প্রস্তুতির বিষয়টি জানানো হয়েছে।
এর আগে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতও জানিয়েছিলেন, সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই এয়ারবাসের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করতে চায়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তি স্বাক্ষরের পর উড়োজাহাজের মূল্য এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক শর্ত প্রকাশ করা হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩১ সাল থেকে ধাপে ধাপে এসব উড়োজাহাজ সরবরাহ শুরু হতে পারে।
প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় চারটি এ৩৫০-৯০০ এবং ছয়টি এ৩২১ উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। বড় আকারের এ৩৫০-৯০০ উড়োজাহাজগুলো ইউরোপসহ দীর্ঘ দূরত্বের আন্তর্জাতিক রুটে পরিচালনার জন্য ব্যবহার করা হবে। অন্যদিকে এ৩২১ উড়োজাহাজগুলো আঞ্চলিক, মধ্যপ্রাচ্য এবং এশিয়ার বিভিন্ন গন্তব্যে চলাচল করবে। এর ফলে যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী তুলনামূলক কম ব্যয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শুধু এয়ারবাস নয়, একই সময়ে বোয়িং থেকেও নতুন উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে বিমান। প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে আটটি ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ উড়োজাহাজ। পুরো বোয়িং প্যাকেজের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই দুটি পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বহরে মোট ২৪টি নতুন প্রজন্মের উড়োজাহাজ যুক্ত হবে। এটি হবে সংস্থাটির ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ বহর সম্প্রসারণ কর্মসূচি। বিশ্লেষকদের মতে, একই সঙ্গে দুই শীর্ষ নির্মাতার উড়োজাহাজ বহরে অন্তর্ভুক্ত করা হলে পরিচালন সক্ষমতা যেমন বাড়বে, তেমনি ভবিষ্যতে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাও কমবে।
সরকারও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে বোয়িং ও এয়ারবাস—উভয় প্রতিষ্ঠানের উড়োজাহাজ বহরে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এতে বিভিন্ন ধরনের রুট ও যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী বহর পরিচালনা আরও নমনীয় হবে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।
বিমানের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আরও বড়। সংস্থাটি ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বহরে মোট ৪৭টি উড়োজাহাজ যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এই পরিকল্পনার মাধ্যমে নতুন আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ফ্লাইট চালু, বিদ্যমান রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বাংলাদেশকে একটি আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই বহর সম্প্রসারণ পরিকল্পনার সঙ্গে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর বিষয়টিও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। নতুন টার্মিনাল চালু হলে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। ফলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আরও সহজ হবে, পর্যটন খাতের সম্প্রসারণ ঘটবে এবং দেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগও শক্তিশালী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন উড়োজাহাজ কেনাই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে দক্ষ জনবল তৈরি, রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং লাভজনক রুট ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয় সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে পৌঁছাতে পারবে। একই সঙ্গে দেশের আকাশপথে যাত্রীসেবা, বাণিজ্য ও পর্যটন খাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

