২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের দাবি ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামো বদলের এক শক্তিশালী প্রত্যাশার প্রতিফলন। মানুষের আশা ছিল, প্রশাসন হবে নিরপেক্ষ, পুলিশ হবে পেশাদার, বিচার বিভাগ হবে স্বাধীন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে কাজ করবে। কিন্তু অভ্যুত্থানের দুই বছর পর এবং নির্বাচিত সরকারের ছয় মাস পার হওয়ার পর প্রশ্ন উঠছে—সেই প্রত্যাশার কতটা বাস্তবে রূপ পেয়েছে?
গত দুই বছরে রাষ্ট্র সংস্কারকে কেন্দ্র করে একাধিক কমিশন গঠন, সুপারিশ প্রণয়ন এবং কিছু আইনগত উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, কাঠামোগত পরিবর্তনের গতি এখনও খুব সীমিত। ব্যক্তি পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান পরিচালনার পদ্ধতি, জবাবদিহি এবং ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথম ধাপে সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন নিয়ে ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করে। পরে স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, শ্রম এবং নারীবিষয়ক আরও পাঁচটি কমিশন যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে ১১টি কমিশন শতাধিক সুপারিশ দিলেও সেগুলোর বেশির ভাগই এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।
বিশেষ করে জনপ্রশাসন সংস্কার নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে। দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, প্রশাসনিক সংস্কারের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হলেও তা কার্যত হাতছাড়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, প্রশাসনের ভেতরের প্রভাবশালী অংশই ঠিক করেছে কোন সংস্কার হবে আর কোনটি হবে না। ফলে যে পরিবর্তন হয়েছে, তার অনেকটাই ছিল আনুষ্ঠানিক বা সীমিত পরিসরের।
গত দুই বছরে প্রশাসনে ব্যাপক পদোন্নতি, বদলি ও নতুন নিয়োগ হয়েছে। তবে পদোন্নতির স্বচ্ছ নীতিমালা, স্বাধীন সিভিল সার্ভিস ব্যবস্থাপনা কিংবা চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের নিরপেক্ষ কাঠামো এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ফলে কর্মকর্তা বদলালেও আনুগত্যনির্ভর প্রশাসনিক সংস্কৃতি কতটা পরিবর্তিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে।
শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদের মতে, প্রকৃত সংস্কার বলতে শুধু নেতৃত্ব পরিবর্তন নয়, বরং আইন, প্রতিষ্ঠান ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোগত পরিবর্তনকে বোঝায়। তাঁর মতে, পুরোনো কাঠামোর মধ্যে নতুন মানুষ বসিয়ে টেকসই সংস্কার সম্ভব নয়।
পুলিশ সংস্কারেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন, মানবাধিকার সুরক্ষা, পেশাদার পদোন্নতি ও অভিযোগ তদন্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোন্দকার রফিকুল ইসলামও স্বীকার করেছেন, কমিশনের বড় সুপারিশগুলো এখনও কার্যকর হয়নি। যদিও তাঁর দাবি, আগের তুলনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমেছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, থানায় মামলা গ্রহণে অনীহা, তদন্তের মান, প্রভাবশালীদের প্রভাব এবং হেফাজতে মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। তদন্ত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পৃথক করা কিংবা স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাও এখনো গড়ে ওঠেনি।
দুর্নীতি দমন কমিশনের স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কমিশনকে সাংবিধানিক মর্যাদা, স্বচ্ছ নিয়োগ ও আর্থিক স্বাধীনতা দেওয়ার সুপারিশ থাকলেও এখনো তা বাস্তবায়িত হয়নি। মার্চে আগের কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কমিশনও গঠিত হয়নি, ফলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা এবং বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসনও এখনো পরীক্ষার মুখে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো, রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণের সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় চালু হলেও পরে তা বাতিল করা হয়েছে। বিচারক নিয়োগ ও পদোন্নতিতে নির্বাহী প্রভাব পুরোপুরি কমেনি বলেও মত বিশেষজ্ঞদের।
সংবিধান সংস্কার কমিশন প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছ নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছে। কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হলেও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংশোধন এখনো হয়নি।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাতেও কাঙ্ক্ষিত বিকেন্দ্রীকরণ হয়নি। অনেক জায়গায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির পরিবর্তে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় স্থানীয় সরকার আরও আমলানির্ভর হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক পরিবর্তন এলেও উপাচার্য নিয়োগ, শিক্ষক নিয়োগ ও ছাত্র সংসদ নির্বাচনসহ মৌলিক কাঠামোগত সংস্কার এখনো অনুপস্থিত।
গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, শ্রম ও নারীর অধিকারসংক্রান্ত কমিশনগুলোর সুপারিশও মূলত নীতিগত পর্যায়েই রয়েছে। স্বাধীন গণমাধ্যম, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমিকের অধিকার ও নারীর সমঅধিকার নিয়ে আলোচনা হলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন এখনো দৃশ্যমান নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই বছরে সংস্কার নিয়ে আলোচনা, কমিশন গঠন এবং কিছু আইনি উদ্যোগ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এসব সুপারিশ কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব হয়ে উঠতে পারে তার ওপর। সেই অর্থে রাষ্ট্র সংস্কারের পথ এখনও অনেকটাই অসম্পূর্ণ এবং সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বাস্তবায়ন।

