দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় নগর বরিশালের আবহাওয়া ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। গত ছয় দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শহরটির তাপমাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ। এই পরিবর্তনের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, স্বাস্থ্য এবং আয়-রোজগারে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিজ্ঞান বিভাগের দুজন শিক্ষকের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক তথ্য। ১৯৬১ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬০ বছরের আবহাওয়ার উপাত্ত পর্যালোচনা করে তাঁরা দেখেছেন, এই সময়ে বরিশালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় শূন্য দশমিক ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর বছরপ্রতি গড় বৃষ্টিপাত কমেছে শূন্য দশমিক ১৮ মিলিমিটার করে। গবেষণাটি ২০২০ সালে একটি আন্তর্জাতিক ভূবিজ্ঞান সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়, যেখানে দেশীয় আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যের পাশাপাশি বিদেশি মহাকাশ ও আবহাওয়া সংস্থার উপাত্তও ব্যবহার করা হয়েছে।
গবেষণার তথ্য বলছে, দিনের তুলনায় রাতের তাপমাত্রা বাড়ছে বেশি দ্রুতগতিতে। জুন মাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি, আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি বাড়ছে ফেব্রুয়ারিতে। একই সঙ্গে শীত, প্রাক্-বর্ষা ও বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত কমার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, বিশেষত জুন মাসে বৃষ্টি কমার হার সবচেয়ে বেশি। এর পাশাপাশি বাতাসের গতি সামান্য বেড়েছে এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা বছরে গড়ে শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ হারে বাড়ছে। গবেষকদের আশঙ্কা, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা একযোগে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে তাপপ্রবাহ আরও দুর্বিষহ ও স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এই গবেষণার একজন লেখক, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশগত ভূপদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করছেন, বলছেন যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাত হ্রাসের কারণে মাটির আর্দ্রতা কমছে, সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা তীব্র হচ্ছে। জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত বৃষ্টির মিলিত প্রভাবে জনস্বাস্থ্যে জটিল ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন। তাঁর পরামর্শ, তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা জোরদার করা, নগরে সবুজায়ন বাড়ানো, জলাশয় রক্ষা করা এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
বাস্তবেও এই পরিবর্তনের প্রভাব নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গ্রীষ্মে এখন প্রায়ই তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়, আবার বর্ষায়ও বৃষ্টি অনিয়মিত হয়ে পড়েছে, বৃষ্টি হলেও গরমের তীব্রতা কমছে না তেমন। ফলে বাড়ছে জীবনযাত্রার খরচ। নগরের একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, এখন প্রায় সারা বছরই ঘরে বৈদ্যুতিক পাখা চালিয়ে রাখতে হয়, তাতেও পুরোপুরি স্বস্তি মেলে না।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে যাঁরা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন তাঁদের ওপর। একজন প্রবীণ রিকশাচালক জানান, আগে তিনি সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রিকশা চালাতে পারতেন, কিন্তু এখন তীব্র গরমে দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাঁর দৈনিক আয়ে। বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহের কারণে সারা দেশে প্রায় আড়াই কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলার বা ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা দেশের মোট জিডিপির প্রায় শূন্য দশমিক ৪ শতাংশের সমান।
চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির প্রভাবে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, হৃদ্রোগ এবং শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা বাড়ছে। পাশাপাশি মশাবাহিত ও পানিবাহিত রোগ বিস্তারের জন্যও অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। নগরের একটি ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় গত বছর ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল একটি ছোঁয়াচে চর্মরোগ, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে আগে কখনো এমনভাবে দেখা যায়নি। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত গরম ও আর্দ্র পরিবেশ এই ধরনের রোগের জন্য দায়ী জীবাণুর বংশবৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। স্থানীয় একটি মেডিকেল কলেজের একজন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক জানান, তীব্র গরমে এখন হাসপাতালে জননতন্ত্রের প্রদাহ, চর্মরোগ এবং গর্ভকালীন জটিলতা নিয়ে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, বিশেষত গর্ভাবস্থার প্রথম তিন মাসে অতিরিক্ত ঘাম ও বমির কারণে পানি-লবণশূন্যতাজনিত সমস্যা দেখা যাচ্ছে বেশি।
পরিসংখ্যানেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। কয়েক বছর আগে হঠাৎ করেই বরিশাল বিভাগে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল ডায়রিয়া, যাতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এবং লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরবর্তী বছরগুলোতেও প্রতিবছর কয়েক হাজার থেকে সত্তর হাজারের বেশি মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। একই রকম চিত্র দেখা গেছে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও। এই অঞ্চলে বড় আকারের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাব শুরু হয় কয়েক বছর আগে থেকে, এরপর প্রতিবছরই কমবেশি মানুষ আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। গত বছর সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন প্রায় বাইশ হাজার মানুষ, মারা যান পঞ্চাশের বেশি। চলতি বছরও জুলাই পর্যন্ত কয়েক হাজার মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, প্রাণ হারিয়েছেন কয়েকজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গরমের সঙ্গে ডায়রিয়ার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রচণ্ড গরমে খাবার ও পানি দ্রুত দূষিত হয়ে পড়ে এবং জীবাণুর বংশবিস্তার ঘটে দ্রুত গতিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিরাপদ পানির সংকট ও দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থা, যা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। আবার অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ডেঙ্গু ছড়ানোর জন্য দায়ী মশার বংশবিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
এসব রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ। নগর উপকণ্ঠের এক তরুণ সম্প্রতি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সরকারি হাসপাতালে প্রায় এক সপ্তাহ ভর্তি ছিলেন। তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনা মূল্যে হলেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে গিয়ে তাঁর খরচ হয়েছে বিশ হাজার টাকার বেশি।
তবে এই তপ্ত নগরের মধ্যেও রয়েছে সমাধানের ইঙ্গিত। বরিশালের একটি ঐতিহাসিক এলাকা, যেখানে শতবর্ষী গাছের সারি, দিঘি ও বিস্তৃত উদ্যান একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে এক প্রাকৃতিক শীতল পরিবেশ, তা নগর পরিকল্পনাবিদদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। ঘন গাছপালার ছাউনি সরাসরি সূর্যের তাপ আটকে দেয় এবং আশপাশের তাপমাত্রা তুলনামূলক কম রাখে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও উঠে এসেছে, শহরের তাপ কমাতে কেবল গাছ লাগালেই চলবে না, প্রয়োজন পরিকল্পিতভাবে স্তরে স্তরে সবুজায়ন এবং সুচিন্তিত নগর নকশা।
একজন পরিবেশকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, এই ছায়াঘেরা এলাকাটি প্রমাণ করে যে সঠিকভাবে গাছ লাগানো হলে তা শুধু ছায়া দেয় না, বাতাস চলাচলও স্বাভাবিক রাখে এবং সামগ্রিকভাবে একটি আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করে। স্থানীয় নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের একজন পরিকল্পনাবিদ মনে করেন, শহরের প্রধান সড়কগুলোকে সংযুক্ত করে একটি ধারাবাহিক সবুজ করিডর গড়ে তোলা সম্ভব, যেখানে বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির গাছ লাগিয়ে বৈচিত্র্য আনা যেতে পারে। তাঁর মতে, ভবিষ্যতের সব নগর উন্নয়ন প্রকল্পে গাছ, ঝোপঝাড় ও নিচু উদ্ভিদ মিলিয়ে স্তরযুক্ত সবুজায়ন নিশ্চিত করা গেলে তা একই সঙ্গে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন হলো, বরিশালের ক্রমবর্ধমান উষ্ণতা কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পরিবর্তন নয়, বরং এটি সরাসরি প্রভাব ফেলছে মানুষের স্বাস্থ্য, আয়-রোজগার ও জীবনযাত্রার ব্যয়ে। তাই দ্রুত ও পরিকল্পিত পদক্ষেপ, বিশেষ করে নগর সবুজায়ন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা এবং জলবায়ু সহনশীল নীতিমালা গ্রহণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

