ঢাকার সাভারে একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্থায়ী পরিচালনা কমিটির সভাপতি হয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন। গত ৯ জুলাই তিনি এই দায়িত্ব পান। অথচ উচ্চ আদালতের একাধিক রায় অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা পদাধিকারবলে কোনো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির সভাপতি হতে পারেন না। একই সময়ে তাঁর পরিবারের আরও দুজন সদস্যও পেয়েছেন একই ধরনের দায়িত্ব, যা নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা গেছে, সংসদ সদস্যের স্ত্রী সাবিনা সিদ্দিকাকে গত জুলাই মাসে সাভারের মোফাজ্জল-মোমেনা চাকলাদার মহিলা কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি করা হয়েছে। অথচ ওই কলেজের গভর্নিং বডির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৭ সালের এপ্রিলে, অর্থাৎ নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রায় আট মাস আগেই সভাপতি বদল করে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া গত জুন মাসে সংসদ সদস্যের ছোট ভাই দেওয়ান মোহাম্মদ মঈনউদ্দিনকেও সাভারের শিমুলিয়া শ্যামা প্রসাদ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক নিশ্চিত করেছেন।
দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত পরিচালিত হয় গভর্নিং বডি বা ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে। কলেজ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানে থাকে গভর্নিং বডি, আর মাধ্যমিক স্তরে থাকে ম্যানেজিং কমিটি। এসব কমিটি অনুমোদন দেয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ড, আর স্নাতক পর্যায়ের কলেজের ক্ষেত্রে অনুমোদন দেয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। নিয়মিত কমিটি গঠন সম্ভব না হলে বা কোনো কমিটি ভেঙে দেওয়া হলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের জন্য অস্থায়ী বা অ্যাডহক কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে, যার সভাপতি হন সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডের মনোনীত ব্যক্তি।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের সব বেসরকারি স্কুল-কলেজের পরিচালনা কমিটি ভেঙে দিয়েছিল। তখন উপজেলা পর্যায়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাহী কর্মকর্তাকে অস্থায়ী সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আইনি জটিলতা ও প্রশ্নের সূত্রপাত: সাভারের গাজিরচট আকবর মন্ডল উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের অ্যাডহক কমিটি গঠিত হয় গত ৯ জুলাই, যার সভাপতি করা হয় ঢাকা-১৯ আসনের সংসদ সদস্যকে। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. মোজাফফর হোসাইনের ভাষ্যমতে, ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডই এই কমিটি অনুমোদন করেছে। তিনজনের নাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মাধ্যমে বোর্ডে পাঠানো হয়েছিল, যেখান থেকে অনুমোদন মেলে।
তবে এখানেই তৈরি হয়েছে আইনি প্রশ্ন। ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রচলিত বিধিমালায় সংসদ সদস্যদের সভাপতি হওয়ার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কোনো বাধা ছিল না। ২০০৯ সালের বিধিমালা অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্য তাঁর নির্বাচনী এলাকার সর্বোচ্চ চারটি প্রতিষ্ঠানে সভাপতি হতে পারতেন। কিন্তু নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর ২০১৬ সালে উচ্চ আদালত সেই বিধিমালার একাংশ অবৈধ ঘোষণা করেন, ফলে নিজ এলাকায় সভাপতি হওয়ার সুযোগ আর থাকে না সংসদ সদস্যদের। পরে ২০২০ সালের আরেকটি রায়ে বলা হয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের পরিচালনা কমিটিরও সভাপতি হতে পারবেন না তাঁরা।
চলতি বছরের মার্চে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জারি করা এক পরিপত্রে বলা হয়, অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মনোনয়নের জন্য সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মরত বা অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, স্থানীয় শিক্ষানুরাগী বা সমাজসেবীদের মধ্য থেকে তিনজনের নাম শিক্ষা বোর্ডে পাঠাতে হবে, যেখান থেকে বোর্ড একজনকে বেছে নেবে। পরিপত্রে সংসদ সদস্যদের বিষয়ে সরাসরি কিছু বলা না হলেও শিক্ষা বোর্ডের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদালতের রায় ও পরিপত্রের মূল চেতনা অনুযায়ী অ্যাডহক কমিটিতেও সংসদ সদস্যদের সভাপতি হওয়ার সুযোগ নেই।
এ প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিন দাবি করেন, যথাযথ প্রক্রিয়া মেনেই একটি কমিটি সব নিয়মনীতি যাচাই করে সভাপতি হিসেবে তাঁর অনুমোদন দিয়েছে। তাঁর ভাষ্য, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে শিক্ষা বোর্ডই তা জানিয়ে দিত।
কলেজের পুরোনো সভাপতি সরিয়ে নতুন নিয়োগ। মোফাজ্জল-মোমেনা চাকলাদার মহিলা কলেজে সভাপতি পরিবর্তনের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৪ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য শিহাব উদ্দিন খানকে দুই বছরের জন্য কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের এপ্রিলে। কিন্তু গত ২৩ জুলাই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ পরিদর্শকের সইয়ে পাঠানো এক চিঠিতে তাঁর জায়গায় সাবিনা সিদ্দিকাকে নতুন সভাপতি হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়।
শিহাব উদ্দিন খান জানান, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে কলেজে পাঠদানের পরিবেশ ফেরাতে যোগ্যতা বিবেচনায় তাঁকে প্রথমে অস্থায়ী ও পরে নিয়মিত সভাপতি করা হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ একটি ই-মেইলের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, তাঁকে সরিয়ে নতুন সভাপতি নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী কলেজ থেকে প্রার্থীদের নামের তালিকা পাঠানোর কথা থাকলেও তা মানা হয়নি এবং সামগ্রিক পরিস্থিতিতে তিনি একে সংসদ সদস্যের প্রভাব বিস্তার ও স্বজনপ্রীতির ফল বলেই মনে করেন।
তবে সংসদ সদস্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষকদের আগ্রহেই যথাযথ প্রক্রিয়ায় তাঁর স্ত্রীকে সভাপতি করা হয়েছে, এবং যোগ্যতা বিচার করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন সভাপতি সাবিনা সিদ্দিকা নিজেও জানান, কলেজের শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠাতার আগ্রহেই তিনি এই দায়িত্ব নিয়েছেন এবং শিক্ষার্থী ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মিলে কলেজের উন্নয়নে কাজ করার আশা নিয়েই এগিয়েছিলেন। তবে এখন এই নিয়োগ ঘিরে যেসব জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা আগে থেকে জানা থাকলে তিনি হয়তো এই দায়িত্ব নিতেন না বলেও মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম এ জামান জানিয়েছেন, সভাপতি পরিবর্তনের কোনো প্রস্তাব কলেজের পক্ষ থেকে পাঠানো হয়নি। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সরাসরি ই-মেইলে চিঠি পাঠিয়ে বিষয়টি তাঁদের জানানো হয়েছে মাত্র।
সব মিলিয়ে একই পরিবারের তিন সদস্যের তিনটি ভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সভাপতি পদে আসীন হওয়ার ঘটনা স্থানীয়ভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগকে সামনে এনেছে, যা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও নিয়মতান্ত্রিকতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

