কোনো বাহিনীর নাম, পোশাক কিংবা প্রতীক বদলে দিলে কি তার আচরণও বদলে যায়? নাকি পুরোনো কাঠামো, একই ধরনের নেতৃত্ব, একই ক্ষমতা এবং একই জবাবদিহিহীনতা বহাল থাকলে নতুন নামের আড়ালেও পুরোনো সমস্যাই ফিরে আসে?
র্যাবকে নতুন নামে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা সামনে আসার পর বাংলাদেশে এই প্রশ্নগুলো আবারও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ র্যাবকে ঘিরে বিতর্ক শুধু তার নাম নিয়ে নয়। বিতর্কের মূল জায়গা হলো বাহিনীটির আধাসামরিক চরিত্র, সামরিক ও বেসামরিক সদস্যদের মিশ্র কাঠামো, দীর্ঘদিনের অভিযোগ এবং কার্যকর জবাবদিহির অভাব।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার র্যাবকে বিলুপ্ত না করে নতুন নাম ও আইনের মাধ্যমে পুনর্গঠনের কথা ভাবছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে। কিন্তু বাহিনীর বর্তমান কাঠামোর অধিকাংশ অংশ অক্ষুণ্ন রেখে শুধু নাম পরিবর্তন করা হলে তা কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
পুলিশ ও সামরিক বাহিনী এক নয়
১৮২৯ সালে স্যার রবার্ট পিলের উদ্যোগে ব্রিটেনে প্রথম মহানগর পুলিশ বাহিনী গঠন করা হয়। সেই বাহিনীর সদস্যদের পোশাক হিসেবে নীল রং বেছে নেওয়া হয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল তাদের লাল পোশাকধারী সামরিক বাহিনী থেকে আলাদা হিসেবে তুলে ধরা।
নতুন পুলিশ বাহিনীকে আগ্নেয়াস্ত্র বহন থেকেও বিরত রাখা হয়েছিল, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় বা দূরত্ব তৈরি না হয়। আধুনিক পুলিশব্যবস্থার জনক হিসেবে পরিচিত পিলের প্রণীত নয়টি নীতির প্রথমটিতেই বলা হয়েছিল, পুলিশের প্রধান কাজ হলো অপরাধ ও বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করা। সামরিক শক্তি প্রয়োগ বা কঠোর শাস্তির মাধ্যমে মানুষকে দমন করা পুলিশের মূল দায়িত্ব নয়।
১৮৭৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রণীত পস কমিটাটাস আইনেও বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া দেশের ভেতরে আইন প্রয়োগের কাজে কেন্দ্রীয় সামরিক বাহিনীর ব্যবহার সীমিত করা হয়। এসব ব্যবস্থা গ্রহণের পেছনে একটি মৌলিক ধারণা কাজ করেছে—সামরিক বাহিনী ও পুলিশের উদ্দেশ্য, প্রশিক্ষণ এবং কাজের ধরন এক নয়।
সামরিক বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হলো বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে রক্ষা করা। অন্যদিকে পুলিশের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, অপরাধ তদন্ত করা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করা।
এই দুই বাহিনীর শক্তি প্রয়োগের নীতিও আলাদা। সামরিক সদস্যদের শত্রুকে পরাজিত করার জন্য প্রয়োজন হলে সর্বোচ্চ শক্তি ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পুলিশকে শেখানো হয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার না করতে, নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে এবং সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে হত্যা না করে আদালতে হাজির করতে।
পুলিশ যখন সামরিক চরিত্র ধারণ করে
অপরাধবিজ্ঞানী ও পুলিশ সামরিকীকরণবিষয়ক বিশেষজ্ঞ পিটার বি ক্রাসকার মতে, গত দুই শতকে পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর মধ্যকার স্পষ্ট সীমারেখা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন সরকার জাতীয় নিরাপত্তার ধারণাকে এমনভাবে বিস্তৃত করেছে, যেখানে বাইরের সামরিক হুমকি এবং দেশের ভেতরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে প্রায় একইভাবে দেখা হচ্ছে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ এবং মাদকবিরোধী অভিযানের নামে অনেক দেশের পুলিশ বাহিনী সামরিক অস্ত্র, পোশাক, প্রশিক্ষণ, ভাষা, সাংগঠনিক সংস্কৃতি ও অভিযান পরিচালনার পদ্ধতি গ্রহণ করেছে।
এই প্রক্রিয়াকেই পুলিশ সামরিকীকরণ বলা হয়। অর্থাৎ একটি বেসামরিক পুলিশ বাহিনী যখন ধীরে ধীরে সামরিক বাহিনীর উপকরণ, মনোভাব, নেতৃত্বের ধরন ও অভিযান পদ্ধতি অনুসরণ করতে শুরু করে।
শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং কার্যকর বেসামরিক নজরদারি থাকলে এই ঝুঁকি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু যেসব দেশে গণতান্ত্রিক জবাবদিহি দুর্বল, সেখানে পুলিশ ও সামরিক সদস্যদের নিয়ে গঠিত মিশ্র নিরাপত্তা বাহিনী সহজেই ক্ষমতার অপব্যবহারের হাতিয়ারে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশের র্যাবকে এই ধরনের বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়।
যে উদ্দেশ্যে র্যাব গঠিত হয়েছিল
২০০৪ সালে একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে র্যাব প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা থেকে প্রেষণে সদস্য এনে বাহিনীটি গঠন করা হয়।
ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাস, গুরুতর অপরাধ এবং সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন করা। দ্রুত অভিযান পরিচালনা, সশস্ত্র অপরাধীদের মোকাবিলা এবং জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বিশেষ সক্ষমতা প্রদর্শনের কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে র্যাবের বিরুদ্ধে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বাড়তে থাকে। এসব অভিযোগ কোনো একটি সরকার বা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের আমলে বাহিনীটিকে ঘিরে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
ফলে র্যাবের সমস্যা বিচ্ছিন্ন কিছু সদস্যের আচরণে সীমাবদ্ধ কি না, নাকি এর মূলেই সাংগঠনিক ত্রুটি রয়েছে—সেই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কাঠামোর মধ্যেই সমস্যার উৎস
র্যাবের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের অন্যতম বড় কারণ হিসেবে এর মিশ্র সাংগঠনিক কাঠামোকে চিহ্নিত করা হয়। সামরিক বাহিনী ও পুলিশের সদস্যরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য র্যাবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তাঁরা নিজ নিজ বাহিনীতে ফিরে যান।
এই ব্যবস্থায় কয়েকটি গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি হয়।
প্রথমত, সামরিক দায়িত্ব পালনের জন্য প্রশিক্ষিত সদস্যদের নিয়মিত বেসামরিক আইন প্রয়োগের কাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু নাগরিকের সঙ্গে আচরণ, অপরাধ তদন্ত, সাক্ষ্য সংগ্রহ, ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগ এবং সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার মতো বিষয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ ও পুলিশ প্রশিক্ষণ এক নয়।
দ্বিতীয়ত, বিভিন্ন বাহিনী থেকে আসা সদস্যদের নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও আনুগত্যের সম্পর্ক জটিল হয়ে ওঠে। কাগজে বাহিনীটি পুলিশের নেতৃত্বে থাকলেও অভিযান পরিচালনায় সামরিক কর্মকর্তাদের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে।
তৃতীয়ত, সদস্যরা এক বাহিনী থেকে অন্য বাহিনীতে ফিরে যাওয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা, নজরদারিতে রাখা এবং ভবিষ্যৎ দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
চতুর্থত, র্যাবের ভেতরে গড়ে ওঠা কঠোর ও জবাবদিহিহীন অভিযান সংস্কৃতি সদস্যদের মাধ্যমে অন্য বাহিনীতেও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
কেন বিলুপ্তির দাবি উঠেছে
মানবাধিকার পর্যবেক্ষক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ দীর্ঘদিন ধরে র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়ে আসছে। ২০১১ সালে প্রকাশিত সংস্থাটির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ ও সামরিক বাহিনী থেকে সদস্য এনে অস্থায়ীভাবে র্যাবে দায়িত্ব দেওয়া একটি গুরুতর সমস্যার জন্ম দিয়েছে।
সামরিক সদস্যদের যথাযথ বেসামরিক পুলিশ প্রশিক্ষণ ছাড়াই আইন প্রয়োগের দায়িত্ব দিলে নির্যাতন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে সদস্যদের নিয়মিত বদলি এবং নিজ বাহিনীতে ফিরে যাওয়ার কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় অনেক মানবাধিকার সংস্থা র্যাবকে শুধু সংস্কার করার পক্ষে নয়। তাদের মতে, যে বাহিনীর আইনগত ক্ষমতা, পরিচালন সংস্কৃতি এবং নেতৃত্ব কাঠামো দীর্ঘদিনেও বদলানো যায়নি, সেটিকে বিলুপ্ত করে বেসামরিক পুলিশকে পেশাদারভাবে শক্তিশালী করাই কার্যকর সমাধান।
গুম তদন্ত কমিশনের পর্যবেক্ষণ
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনও র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে।
কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশে গুম, নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার যে কাঠামো গড়ে উঠেছিল, তার কেন্দ্রে র্যাবের ভূমিকা ছিল। বাহিনীটির আইনগত দায়িত্ব, অভিযান পরিচালনার সংস্কৃতি এবং নেতৃত্বের ধারা সংস্কারের প্রচেষ্টায় কার্যকরভাবে সাড়া দেয়নি।
সে কারণে কমিশন র্যাবকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিলুপ্ত করার কথা বলে। একই সঙ্গে বাহিনীটি বিলুপ্ত করার সময় গুরুত্বপূর্ণ নথি ও প্রমাণ সংরক্ষণ এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিলুপ্তি মানে অতীতের অভিযোগ ও প্রমাণ মুছে ফেলা নয়। বরং বাহিনীটি ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি নথি সংরক্ষণ, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ তদন্ত এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে যে উদ্বেগ
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর বাংলাদেশে ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধান প্রতিবেদনে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে।
প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশের পুলিশ ব্যবস্থার সামরিকীকরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। বলা হয়, সামরিক চরিত্রের নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান পরিচালনার সময় তুলনামূলকভাবে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের দিকে বেশি ঝুঁকতে পারে। এতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কাও বাড়ে।
র্যাবের বিষয়ে প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ ছিল, বাহিনীটি আনুষ্ঠানিকভাবে একজন পুলিশ কর্মকর্তার নেতৃত্বে পরিচালিত হলেও অভিযানের ওপর প্রেষণে আসা সেনাবাহিনীর একজন কর্নেলের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল। গত দুই দশকে র্যাবের বিরুদ্ধে অপরাধে সন্দেহভাজন ব্যক্তি, বিরোধী রাজনীতিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং ক্ষমতাসীনদের প্রতি অনুগত নয় বলে বিবেচিত রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, নির্যাতন ও অন্যান্য গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগ তৈরি হয়েছে।
এ ধরনের পর্যবেক্ষণ দেখায়, সমস্যাটি শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অভিযানের নয়। অভিযোগগুলো বাহিনীটির দীর্ঘমেয়াদি পরিচালন পদ্ধতি এবং ক্ষমতা ব্যবহারের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
নতুন আইনে কি পুরোনো ব্যবস্থাই থাকবে?
এত শক্তিশালী সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার র্যাব বিলুপ্ত করতে অনাগ্রহী বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। সরকারের পরিকল্পনা হলো বাহিনীটির নাম পরিবর্তন করে নতুন আইনের অধীনে পরিচালনা করা।
এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি নতুন আইনের খসড়া তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করেছে। কিন্তু প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় আগের মতোই সশস্ত্র বাহিনী এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা থেকে প্রেষণে সদস্য নেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
এখানেই মূল প্রশ্ন তৈরি হয়। যে মিশ্র কাঠামোকে র্যাবের জবাবদিহিহীনতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেটিই যদি নতুন বাহিনীতে বহাল থাকে, তাহলে শুধু নাম বদলে কী পরিবর্তন হবে?
নতুন পোশাক, প্রতীক, আইন বা নাম জনমনে সাময়িকভাবে পরিবর্তনের ধারণা তৈরি করতে পারে। কিন্তু সদস্য সংগ্রহের পদ্ধতি, নেতৃত্ব, অভিযান পরিচালনা, শক্তি প্রয়োগ, তদন্ত এবং জবাবদিহির ব্যবস্থা আগের মতো থাকলে ঝুঁকিও প্রায় একই থাকবে।
বিরোধী দলে এক অবস্থান, সরকারে আরেক অবস্থান
র্যাব নিয়ে বিএনপির বর্তমান অবস্থান বিশেষভাবে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ বিরোধী দলে থাকাকালে দলটি একাধিকবার র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছিল।
মে ২০১৪ সালে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া র্যাব ভেঙে দেওয়ার দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, বাহিনীটি গুম, হত্যা ও অপহরণের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। মানুষ হত্যাকারী এমন বাহিনী রাখার প্রয়োজন নেই বলে তিনি মত দিয়েছিলেন।
একই মাসে বিএনপির তৎকালীন জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানান। লন্ডনে তিনি র্যাব বিলুপ্তির দাবিতে একটি স্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচি শুরু করেন। তাঁর মতে, জনগণের মধ্যে র্যাবের প্রতি আস্থা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং বাহিনীটি বিলুপ্ত করা জনদাবিতে পরিণত হয়েছিল।
পরবর্তী সময়েও বিএনপি বিভিন্ন উপলক্ষে একই অবস্থান তুলে ধরে।
ডিসেম্বর ২০২৪-এর সুপারিশ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ডিসেম্বর ২০২৪ সালে বিএনপি পুলিশ সংস্কার কমিশনের কাছে র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তৎকালীন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং দলটির পুলিশ প্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান হাফিজ উদ্দিন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে র্যাব ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছে এবং দেশের ভেতরে এটি ভয়ংকর শক্তিতে পরিণত হয়েছিল।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম এবং হত্যাকাণ্ডের বড় অংশের সঙ্গে র্যাবের নাম জড়িয়েছে বলেই দলটি বাহিনীটি ভেঙে দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
ফলে এখন সরকারে গিয়ে বিএনপি যদি সেই অবস্থান থেকে সরে আসে, তাহলে রাজনৈতিক ও নৈতিক দুই ধরনের প্রশ্নই উঠবে। বিরোধী দলে থাকাকালে যে বাহিনীকে বিলুপ্ত করা জনদাবি বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এসে সেই বাহিনীর কাঠামো কেন ধরে রাখা হবে?
নাম নয়, ক্ষমতার ধরনই আসল
দুই দশকের বেশি সময়ের অভিজ্ঞতা দেখায়, র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ কোনো একক রাজনৈতিক দলের শাসনামলে সীমিত ছিল না। ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, বাহিনীটি সরকারের শক্তিশালী ও জবাবদিহিহীন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার অভিযোগ পেয়েছে।
এটি সম্ভব হয়েছে শুধু র্যাব নামটির কারণে নয়। বরং বাহিনীটির বিস্তৃত ক্ষমতা, আধাসামরিক কাঠামো, সামরিক সদস্যের অংশগ্রহণ, গোপনীয় অভিযান এবং দুর্বল বেসামরিক জবাবদিহির কারণে।
একই ধরনের ক্ষমতা ও কাঠামো রেখে নতুন নাম দেওয়া হলে পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর নিশ্চয়তা থাকে না। বরং নতুন নামের কারণে কিছু সময়ের জন্য পুরোনো অভিযোগ আড়ালে চলে যেতে পারে। পরে একই ধরনের অভিযান ও অভিযোগ আবারও সামনে আসার আশঙ্কা থাকবে।
তাই র্যাবের নাম পরিবর্তনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রাষ্ট্র আদৌ নিয়মিত বেসামরিক পুলিশি কাজে সামরিক সদস্যদের ব্যবহার বন্ধ করতে প্রস্তুত কি না।
নতুন বাহিনী হলে কী বদলাতে হবে
সরকার যদি বিশেষায়িত অপরাধ দমন সক্ষমতা রাখতে চায়, তাহলে সেটিকে পুরোপুরি বেসামরিক পুলিশ কাঠামোর মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। সদস্যদের স্থায়ীভাবে পুলিশ থেকে নিয়োগ দিতে হবে এবং মানবাধিকার, অপরাধ তদন্ত, প্রমাণ সংগ্রহ, জিজ্ঞাসাবাদ ও ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগের বিষয়ে উন্নত প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
প্রতিটি অভিযান লিখিত নিয়মের অধীনে পরিচালিত হতে হবে। আটকের পর ব্যক্তিকে কোথায় নেওয়া হয়েছে, কখন আদালতে হাজির করা হবে এবং কোন কর্মকর্তার দায়িত্বে রাখা হয়েছে—এসব তথ্য নথিভুক্ত ও যাচাইযোগ্য হওয়া প্রয়োজন।
হেফাজতে মৃত্যু, গুম, নির্যাতন বা বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ উঠলে বাহিনীর নিজস্ব তদন্তের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। স্বাধীন তদন্ত সংস্থা, বিচার বিভাগীয় নজরদারি এবং সংসদীয় জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে শুধু নিম্নপদস্থ সদস্য নয়, নির্দেশদাতা ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে। তা না হলে বাহিনীর নাম বা পোশাক বদলালেও শাস্তিহীনতার সংস্কৃতি বদলাবে না।
সংস্কারের আগে অতীতের বিচার
নতুন কোনো ব্যবস্থা তৈরির আগে র্যাবের বিরুদ্ধে ওঠা অতীতের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন। গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে তথ্য প্রকাশ, গোপন আটকস্থল শনাক্ত, নথি সংরক্ষণ এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা ছাড়া শুধু ভবিষ্যৎ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাসযোগ্য হবে না।
বাহিনীটির নাম পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে অতীতের দায় মুছে ফেলার চেষ্টা করা হলে তা ভুক্তভোগীদের জন্য নতুন অবিচার সৃষ্টি করবে। নতুন আইন যেন পুরোনো অপরাধের দায়মুক্তির পথ না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রথম শর্ত হলো সত্য স্বীকার করা। দ্বিতীয় শর্ত হলো জবাবদিহি। আর তৃতীয় শর্ত হলো একই ধরনের লঙ্ঘন যাতে আর ঘটতে না পারে, তার জন্য কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা তৈরি করা।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের দাবি ছিল না। এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির মধ্যে আনা, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অবসান এবং নাগরিকের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার আকাঙ্ক্ষাও যুক্ত ছিল।
সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে বিতর্কিত কোনো বাহিনীকে শুধু নতুন নামে ফিরিয়ে আনা যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রকে দেখাতে হবে, নিরাপত্তার নামে ক্ষমতার অপব্যবহার আর গ্রহণযোগ্য হবে না।
একই কাঠামো, একই ধরনের নেতৃত্ব এবং একই বিস্তৃত ক্ষমতা রেখে নতুন পরিচয় দিলে তা প্রকৃত পরিবর্তনের পরিবর্তে পুরোনো ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখা হবে।
সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন
বিএনপি একসময় র্যাব বিলুপ্তির দাবি জানিয়েছিল। ডিসেম্বর ২০২৪ সালেও দলটি একই সুপারিশ করেছিল। এখন ক্ষমতায় থাকার অবস্থায় যদি দলটি বাহিনীটির নাম বদলে একই ধরনের কাঠামো ধরে রাখে, তাহলে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন উঠবেই।
সরকার কি সত্যিই র্যাবের সঙ্গে যুক্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের সংস্কৃতি শেষ করতে চায়, নাকি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য একই শক্তিশালী বাহিনীকে অন্য নামে টিকিয়ে রাখতে চায়?
এই প্রশ্নের উত্তর সরকারের বক্তব্যে নয়, নতুন আইনের ধারায়, সদস্য নিয়োগের পদ্ধতিতে, নেতৃত্ব কাঠামোয় এবং স্বাধীন জবাবদিহির ব্যবস্থায় পাওয়া যাবে।
র্যাবের সমস্যা তার নামের মধ্যে নয়। সমস্যা হলো এর আধাসামরিক কাঠামো, বেসামরিক আইন প্রয়োগে সামরিক সদস্যের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার, গোপনীয় অভিযান, দুর্বল নজরদারি এবং অভিযোগের পরও কার্যকর বিচার না হওয়া।
এই মৌলিক বিষয়গুলো অপরিবর্তিত রেখে নতুন নাম দেওয়া হলে তা হবে শুধু পুরোনো কাঠামোকে নতুন মোড়কে হাজির করা। এতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি কমবে না, বরং নতুন পরিচয়ের আড়ালে একই ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার চলতে পারে।
বাংলাদেশ যদি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে চায় এবং জাতিসংঘ, গুম তদন্ত কমিশন ও দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থার সুপারিশ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে, তাহলে র্যাব বিলুপ্ত করে একটি পেশাদার, জবাবদিহিমূলক ও জনবান্ধব বেসামরিক পুলিশব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প খুব সীমিত।
নাম বদল মানুষের স্মৃতি সাময়িকভাবে বিভ্রান্ত করতে পারে। কিন্তু কাঠামো না বদলালে ইতিহাসও বদলায় না।

