ডিজিটাল সেবা যত বিস্তৃত হচ্ছে, সাইবার হামলা, তথ্য চুরি এবং অনলাইন জালিয়াতির ঝুঁকিও তত বাড়ছে। এই বাস্তবতায় দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সাইবার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কতটা প্রস্তুত, তা প্রথমবারের মতো একটি অভিন্ন মানদণ্ডে মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যেই চালু হচ্ছে জাতীয় রেটিং ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে একটি মানসম্মত স্কোর ও গ্রেড।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে মঙ্গলবার এই নতুন কাঠামোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এটি দেশের সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি, কারণ এতদিন পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠান সাইবার ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটা সক্ষম—তা পরিমাপের জন্য একক ও সমন্বিত কোনো মূল্যায়ন পদ্ধতি ছিল না।
নতুন এই ব্যবস্থার ভিত্তি গড়ে তোলা হয়েছে চারটি প্রধান স্তম্ভের ওপর। প্রতিটি স্তম্ভ প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল সেবার মানকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করবে।
প্রথম স্তম্ভে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি ও তথ্য নিরাপত্তা পরিচালনা ব্যবস্থার ওপর, যার ওজন থাকবে মোট মূল্যায়নের ২০ শতাংশ। এখানে নেতৃত্ব, নীতিমালা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, সাংগঠনিক কাঠামো এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা যাচাই করা হবে।
দ্বিতীয় স্তম্ভের ওজন ৩০ শতাংশ। এতে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, তথ্যকেন্দ্র, নেটওয়ার্ক, সার্ভার, তথ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা, দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় মূল্যায়ন করা হবে।
তৃতীয় স্তম্ভও মোট নম্বরের ৩০ শতাংশ বহন করবে। এই অংশে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, তথ্য সুরক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, সাইবার হামলার প্রতিক্রিয়া, দুর্বলতা শনাক্তকরণ এবং নিরীক্ষা-সংক্রান্ত মানদণ্ড বিবেচনায় নেওয়া হবে।
অবশিষ্ট ২০ শতাংশ নম্বর নির্ধারিত হবে ডিজিটাল সেবা ও ব্যবহারকারীকেন্দ্রিক সক্ষমতার ওপর। অর্থাৎ একটি প্রতিষ্ঠান কতটা মানসম্পন্ন ডিজিটাল সেবা দিচ্ছে, সফটওয়্যার পরিচালনা কতটা কার্যকর, তথ্যপ্রযুক্তি সেবার মান কেমন এবং ধারাবাহিক উন্নয়নের জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ও মূল্যায়নের আওতায় আসবে।
পুরো মূল্যায়ন কাঠামোতে মোট ১৩১টি সূচক রাখা হয়েছে। প্রতিটি সূচকে শূন্য থেকে চার পর্যন্ত পাঁচটি ধাপে নম্বর দেওয়া হবে। শূন্য মানে কোনো ব্যবস্থা নেই, আর চার মানে সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নত। সব সূচকের নম্বর নির্ধারিত ওজন অনুযায়ী যোগ করে ১০০-এর মধ্যে মোট স্কোর তৈরি করা হবে। এরপর সেই স্কোরের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ থেকে ই পর্যন্ত গ্রেড দেওয়া হবে, যেখানে এ সর্বোচ্চ এবং ই সর্বনিম্ন মান নির্দেশ করবে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই সূচকগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করে তৈরি করা হয়েছে। ফলে একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্যপ্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা একই কাঠামোর মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
এতদিন দেশে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামো, সরকারি সংস্থা কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইবার প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য কোনো সমন্বিত ব্যবস্থা ছিল না। ফলে কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, কোন প্রতিষ্ঠানে ঝুঁকি বেশি কিংবা কোথায় দ্রুত উন্নয়ন প্রয়োজন—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া কঠিন ছিল। নতুন রেটিং ব্যবস্থা সেই শূন্যতা পূরণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই মূল্যায়নের মাধ্যমে শুধু দুর্বলতা চিহ্নিত করাই নয়, তথ্যপ্রযুক্তি নিরীক্ষা, নিরাপত্তা পরীক্ষা, বাজেট পরিকল্পনা, জনবল উন্নয়ন এবং অবকাঠামো বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার নির্ধারণ সহজ হবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের একটি জাতীয় সক্ষমতা সূচক তৈরি হবে, যার ভিত্তিতে প্রতিবছর রেটিং প্রকাশ করা হবে। এতে নীতিনির্ধারণ আরও তথ্যভিত্তিক হবে এবং দেশের সামগ্রিক সাইবার প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে।
ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থায় আরও উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। এর মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় মূল্যায়ন ব্যবস্থা, জমা দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি, খাতভিত্তিক তুলনামূলক বিশ্লেষণ, ঝুঁকিনির্ভর পরামর্শ এবং প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির মতো সুবিধা যুক্ত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের ডিজিটাল অর্থনীতি দ্রুত সম্প্রসারিত হলেও সাইবার ঝুঁকিও সমান গতিতে বাড়ছে। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৬০ লাখ। ব্যবহারকারী যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে তথ্য চুরি, আর্থিক প্রতারণা এবং গুরুত্বপূর্ণ সেবায় সাইবার হামলার আশঙ্কা।
গত এক দশকে কয়েকটি বড় ঘটনা সেই ঝুঁকির বাস্তবতা সামনে এনেছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পরে ২০২৩ সালে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনসংক্রান্ত সরকারি তথ্যভান্ডারে নিরাপত্তা দুর্বলতার কারণে ৫ কোটিরও বেশি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য, এমনকি জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যও ফাঁস হয়ে যায়।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অবকাঠামোর ওপর সম্ভাব্য সাইবার হামলার বিষয়ে সতর্ক করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদারের নির্দেশনা দেয়। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের সাইবার হুমকি পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেশে ১৮৮টি সাইবার নিরাপত্তা ঘটনা নথিভুক্ত হওয়ার তথ্য উঠে আসে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ালেই ডিজিটাল রূপান্তর সফল হয় না; এর সঙ্গে নিরাপদ অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, কার্যকর নীতিমালা এবং নিয়মিত মূল্যায়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নতুন জাতীয় রেটিং ব্যবস্থা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দুর্বলতা দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন করতে পারবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতামূলক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও নিরাপদ ও স্থিতিশীল করতে সহায়ক হবে।

