বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানার সংখ্যা যত বাড়ছে, ততই দীর্ঘ হচ্ছে কাজের খোঁজে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের সারি। দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে প্রতিদিন ভোর থেকেই অসংখ্য শ্রমিক বিভিন্ন কারখানার ফটকে জড়ো হচ্ছেন একটি চাকরির আশায়। কিন্তু অধিকাংশই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ফিরছেন খালি হাতে। শিল্পখাতে উৎপাদন কমে যাওয়া, রপ্তানি আদেশের সংকট, আর্থিক অস্থিরতা এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের স্থায়ীভাবে কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব এখন সবচেয়ে বেশি পড়ছে শ্রমজীবী মানুষের ওপর।
এই সংকটের বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে ৫৫ বছর বয়সী পোশাকশ্রমিক মিনারা বেগমের জীবনে। বহু বছর দেশের বিভিন্ন পোশাক কারখানায় অপারেটর হিসেবে কাজ করা মিনারা সম্প্রতি চাকরি হারিয়েছেন। হাতে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও চাকরির আবেদনপত্র নিয়ে তিনি গাজীপুরের ভোগড়া এলাকার একটি কারখানার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন নতুন কাজের আশায়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই নিয়োগ কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়।
গত ১৫ দিন ধরে প্রতিদিনই তিনি এক কারখানা থেকে আরেক কারখানায় ঘুরছেন। কিন্তু কোথাও কাজ মিলছে না। তার ভাষায়, বাসাভাড়া, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ এবং বকেয়া বিল কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে তিনি চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। আরও কয়েকজন সাবেক সহকর্মীকে নিয়ে প্রতিদিন কাজের খোঁজে বের হলেও কেউই এখন পর্যন্ত নতুন চাকরি পাননি। এমনকি কিছু কারখানা আগের কর্মস্থলের নাম শুনেই নিয়োগে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
শুধু মিনারা নন, গাজীপুরের চন্দনা চৌরাস্তা, বাসন, ভোগড়া, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, টঙ্গী, গাজীপুর সদর, শ্রীপুর ও কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে প্রতিদিন শত শত নারী-পুরুষ শ্রমিক চাকরির আশায় লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। কিন্তু নিয়োগের সুযোগ সীমিত হওয়ায় অধিকাংশকেই হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ মে থেকে ২০২৬ সালের ১১ এপ্রিল পর্যন্ত গাজীপুর জেলায় ১৫৮টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। বর্তমানে জেলায় চালু রয়েছে ২ হাজার ৬৭৪টি কারখানা। বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৫১টি আর্থিক সংকটে, ৮৩টি পর্যাপ্ত কাজের আদেশ না থাকায়, ৭টি শ্রমিক অসন্তোষের কারণে এবং ২টি শেয়ারহোল্ডারদের বিরোধের কারণে কার্যক্রম বন্ধ করেছে। এছাড়া কাঁচামালের সংকটসহ বিভিন্ন কারণে আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।
বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কয়েকটি ইউনিটও অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রয়েছে কিংবা উৎপাদন স্থগিত করেছে। এর ফলে কয়েক লাখ শ্রমিক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হারিয়েছেন। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, বড় প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু ওই প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং কাঁচামাল সরবরাহকারী, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একটি শিল্পগোষ্ঠীর পরিচালক জানিয়েছেন, বাজারের অস্থিরতা এবং ব্যাংকিং খাতের জটিলতার কারণে তাদের চারটি ইউনিট বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। উদ্যোক্তাদের মতে, ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন হওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা মিলিয়ে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকার লড়াই করছে।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে কিছু প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত সমস্যা। অনেক শ্রমিক দাবি করছেন, পূর্বের প্রতিষ্ঠানের তথ্যভান্ডারে তাদের নামের পাশে নেতিবাচক মন্তব্য যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে, যার কারণে অন্য কারখানায় চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। শ্রমিক নেতাদের অভিযোগ, যারা বেতন-ভাতা আদায়ের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন বা শ্রম অধিকার নিয়ে সোচ্চার ছিলেন, তাদের একটি অংশকে অনানুষ্ঠানিকভাবে কালো তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে।
শ্রমিক সংগঠনের নেতারা আরও বলেন, বড় ও মাঝারি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে এটি শুধু শিল্পখাতের সংকট নয়, বরং একটি মানবিক ও সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের যে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা, সমঝোতার মাধ্যমে তার চেয়ে কম অর্থ দিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নারী শ্রমিকরা। দীর্ঘদিন একটি পোশাক কারখানায় কাজ করা ৪০ বছর বয়সী এক নারী শ্রমিক জানান, এক বছর আগে শ্রমিক অসন্তোষের পর তাদের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক কাজ হারান, যার প্রায় ৭০ শতাংশই নারী। এরপর থেকে তিনি নতুন কোনো চাকরি পাননি। তার দাবি, কর্মসংস্থান সম্পর্কিত তথ্যভান্ডারে তাকে চাকরিচ্যুত হিসেবে উল্লেখ করায় বিভিন্ন কারখানায় আবেদন করেও কাজ মেলেনি।
পরিসংখ্যানও দেখাচ্ছে, তৈরি পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় কমছে। ১৯৮০ থেকে ১৯৯৪ সালের মধ্যে এই খাতে প্রায় ৮০ শতাংশ শ্রমিকই নারী ছিলেন। কিন্তু ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, সেই হার নেমে এসেছে প্রায় ৫৩ শতাংশে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক শিল্প সংকটের ধাক্কা নারী শ্রমিকদের ওপর তুলনামূলক বেশি পড়ছে।
অনেক শ্রমিকের কাছে এখন শহরে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে উঠেছে। কেউ কেউ গ্রামে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন, আবার কেউ জীবিকার তাগিদে গৃহকর্মীর মতো বিকল্প পেশায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দীর্ঘদিন শিল্পে কাজ করার পরও নতুন কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা না থাকায় তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশের গতি কমে যাওয়া, জ্বালানি সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, ব্যাংকঋণের সীমাবদ্ধতা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা শিল্পখাতকে চাপে ফেলেছে। ফলে নতুন নিয়োগ কমে গেছে, আর যেসব প্রতিষ্ঠান টিকে আছে তারাও ব্যয় কমাতে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
তাদের মতে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু সাময়িক সমাধান যথেষ্ট হবে না। শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়নের ব্যবস্থা, শ্রমিকদের তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং পুনঃনিয়োগে বৈষম্য দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ধরে রাখতে উৎপাদন সক্ষমতা ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করা জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য, তৈরি পোশাক শিল্প বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান ভিত্তি। তাই কারখানা বন্ধের সংখ্যা বাড়তে থাকলে এর প্রভাব শুধু শ্রমিকদের জীবনেই নয়, সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং কর্মসংস্থানেও পড়বে। সে কারণে শিল্পকে সচল রাখা এবং শ্রমিকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

