বাংলাদেশের শিল্পকারখানা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের ছাদকেই এখন বিদ্যুৎকেন্দ্রে পরিণত করছে। জ্বালানি বিষয়ক আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দেশের বৃহৎ শিল্প খাতে রুফটপ সোলারের ব্যবহার আগের ধারণার চেয়ে অনেক এগিয়ে গেছে এবং এটি দিনের বেলার বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, দেশে ছাদে বসানো সৌরবিদ্যুতের মোট সক্ষমতা এখন প্রায় ৪১৮ মেগাওয়াট। কিন্তু আইইইএফএর হিসাব একেবারেই ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। সংস্থাটির প্রাক্কলন অনুযায়ী, শুধু দেশের ২৩৯টি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানই মিলিতভাবে উৎপাদন করছে ৬৬৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ। এর সঙ্গে ছোট ও মাঝারি আকারের স্থাপনাগুলো যোগ করলে মোট সক্ষমতা এক হাজার মেগাওয়াটও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা। অর্থাৎ বাস্তব চিত্র সরকারি হিসাবের প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি।
এই প্রবণতার পেছনে মূল কারণ হিসেবে গ্রিড বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান দামকেই দায়ী করছে আইইইএফএ। শিল্প মালিকরা এখন হিসাব কষে দেখছেন, প্রাথমিক বিনিয়োগ সামান্য বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে সৌরবিদ্যুৎ অনেক বেশি সাশ্রয়ী। ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা টেনে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাহিদার উৎসের কাছাকাছি ছোট ছোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুললে আমদানি নির্ভর জ্বালানির ওপর চাপ অনেকটাই কমে আসে। বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র বা দীর্ঘ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের বদলে এই বিকেন্দ্রীভূত মডেল তুলনামূলক কম সময় ও খরচে বাস্তবায়নযোগ্য।
কৃষিখাতেও একই সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে। দেশের সেচ ব্যবস্থায় এখনো ডিজেলচালিত পাম্পের প্রাধান্য রয়েছে, যার জন্য প্রতিবছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয় জ্বালানি আমদানিতে। আইইইএফএর হিসাব অনুযায়ী, এই ডিজেল পাম্পগুলোর মাত্র এক-তৃতীয়াংশকেও সৌরচালিত করা গেলে বছরে প্রায় ২৪৪ মিলিয়ন ডলার তথা প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে। কৃষি অর্থনীতির জন্য এটি একটি বড় স্বস্তির খবর হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি বেশ কিছু বাধার কথাও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। এক সময় সৌরযন্ত্রাংশ আমদানিতে বিশেষ শুল্ক সুবিধা থাকলেও সাম্প্রতিক কর কাঠামোয় পরিবর্তনের পর শিল্প খাতের রুফটপ সোলার প্রকল্পে কার্যকর করের হার এক শতাংশ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে সতেরো শতাংশে। এর মধ্যে পনেরো শতাংশ মূল্য সংযোজন কর এবং দুই শতাংশ অগ্রিম আয়কর অন্তর্ভুক্ত। ফলে প্রকল্প স্থাপনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যা নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
আরেকটি সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন খোদ বিনিয়োগকারীরাই। নিয়ম অনুযায়ী নেট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় গ্রিডের সঙ্গে সৌর সংযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া দশ থেকে পনেরো দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই প্রক্রিয়ায় প্রায়ই অনেক বেশি সময় লেগে যাচ্ছে, যা উদ্যোক্তাদের হতাশ করছে এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশে মোট দশ হাজার চারশ পঞ্চাশ মেগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার পাঁচশ মেগাওয়াট, অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি আসার কথা রুফটপ সোলার থেকেই। এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন করতে হলে বর্তমান বাধাগুলো দূর করা জরুরি বলে মনে করছে আইইইএফএ।
এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রতিবেদনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সুপারিশও করা হয়েছে। সৌরযন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার করে স্থাপন খরচ কমানো, অনলাইন আবেদন প্রক্রিয়া নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে গ্রিড সংযোগে দেরি কমিয়ে আনা এবং ব্যাটারি স্টোরেজ ও স্মার্ট মিটারের ব্যবহার সম্প্রসারণ করার কথা বলা হয়েছে সুপারিশে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা কমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

