দেশে কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মানুষের স্বাস্থ্য, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশ রক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে এমন একটি নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে, যেখানে কীটনাশকের আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদন, নিবন্ধন, গুণগত মান যাচাই, বাজারজাতকরণ, ব্যবহার এবং তদারকির পুরো প্রক্রিয়াকে একই কাঠামোর আওতায় আনা হবে। একই সঙ্গে অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনার সুপারিশও নতুন নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
কৃষি মন্ত্রণালয় গত জুলাই মাসে এ লক্ষ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। কমিটি ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে এবং একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে বিদ্যমান আইন, বিধিমালা, নিবন্ধন ব্যবস্থা, লাইসেন্সিং, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণাগার ও তদারকি কার্যক্রম পর্যালোচনা করছে। তাদের লক্ষ্য হলো এমন একটি সমন্বিত নির্দেশিকা তৈরি করা, যা কৃষি উৎপাদন বজায় রাখার পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে কীটনাশকের সবচেয়ে বড় সমস্যা এর প্রয়োজনীয়তা নয়, বরং অনিয়ন্ত্রিত ও অযৌক্তিক ব্যবহার। অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ করা হয়। একই ধরনের রাসায়নিক দীর্ঘদিন ব্যবহার, অনুমোদনহীন মিশ্রণ তৈরি এবং ফসল কাটার ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত স্প্রে করার কারণে খাদ্যে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থেকে যাচ্ছে। এর ফলে শুধু মানুষের স্বাস্থ্যই নয়, মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য এবং কৃষি পরিবেশও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির মুখে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক (কন্দাল ফসল) ড. নির্মল কুমার দত্ত জানিয়েছেন, রাসায়নিক কীটনাশকের যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিকল্প হিসেবে জৈব বালাইনাশক, ফেরোমন ফাঁদ এবং আঠালো ফাঁদের মতো নিরাপদ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের কৌশল মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ এবং অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশকের ব্যবহার ধীরে ধীরে কমিয়ে আনার বিষয়েও সুপারিশ থাকবে। তবে এসব পদক্ষেপ যেন কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেই বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হবে।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশে কীটনাশকের ব্যবহার ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে দেশে কীটনাশক ব্যবহার হয়েছিল ৩৫ হাজার ৫২৩ টন। ২০২৪ সালে সেই পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ৮৩২ টনে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে দেশে আবাদযোগ্য কৃষিজমির পরিমাণ ৮৮ দশমিক ২৯ লাখ হেক্টর। সে হিসাবে প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে ৪ দশমিক ৬২ কেজি কীটনাশক ব্যবহার হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, উদ্বেগের বিষয় শুধু ব্যবহার বৃদ্ধিই নয়, বরং এর প্রয়োগের ধরন। অধিকাংশ কৃষক এখনো কীটনাশক প্রয়োগের পর নির্ধারিত অপেক্ষার সময় মেনে চলেন না। ফলে ফসলে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ থেকেই যায় এবং তা সরাসরি মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রবেশ করে। বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন শাকসবজি ও ফলমূলেও প্রায়ই অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ পাওয়া যাচ্ছে।
এই উদ্বেগের বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের একটি গবেষণায়। সেখানে দেখা যায়, সংগ্রহ করা সবজির নমুনার ২৯ শতাংশের বেশি কীটনাশকের অবশিষ্টাংশে দূষিত ছিল। দূষিত নমুনাগুলোর মধ্যে ৭৩ শতাংশে রাসায়নিকের মাত্রা সর্বোচ্চ অনুমোদিত সীমার চেয়েও বেশি পাওয়া গেছে। এ ধরনের তথ্য জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।
অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে কৃষি পরিবেশে। মাটির উপকারী অণুজীব ধ্বংস হচ্ছে, পরাগায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা মৌমাছির সংখ্যা কমছে, জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। একই রাসায়নিক দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে অনেক পোকামাকড়ের মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়েছে। ফলে কৃষকদের আরও শক্তিশালী এবং বেশি মাত্রার কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে।
নতুন নীতিমালায় শুধু মাঠপর্যায়ের ব্যবহার নয়, বরং পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কোন রাসায়নিক দেশে নিবন্ধিত হবে, কোনটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচিত হবে এবং কোন ক্ষেত্রে জৈব বালাইনাশককে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এসব বিষয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ও সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. খন্দকার শরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, আমদানি করা কীটনাশক কৃষকের হাতে পৌঁছানোর আগেই পরীক্ষাগারে এর মান ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে। দেশের প্রবেশপথগুলোতে পরীক্ষাগার স্থাপনের প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে। সেখানে দ্রুত পরীক্ষা করে ক্ষতিকর উপাদান, ভারী ধাতু কিংবা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অন্য কোনো উপাদান রয়েছে কি না, তা যাচাই করা হবে। কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে বাজারে ছাড়ার আগেই সংশ্লিষ্ট চালান আটকে দেওয়া সম্ভব হবে।
নীতিমালায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ, মাতৃভাষায় সহজ ব্যবহারবিধি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যবহার এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার সম্প্রসারণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল আইন করলেই হবে না; মাঠপর্যায়ে সচেতনতা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিকভাবেও অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক ধাপে ধাপে প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে আসছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। একই সঙ্গে ইউরোপীয় বাজারসহ বিভিন্ন দেশে কৃষিপণ্যে রাসায়নিক অবশিষ্টাংশের গ্রহণযোগ্য সীমা আরও কঠোর হওয়ায় বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি নতুন নীতিমালায় উচ্চ ঝুঁকির রাসায়নিক ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি, ডিজিটাল নজরদারি এবং নিয়মিত অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে শুধু নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত হবে না, দেশের কৃষিপণ্যের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও রপ্তানি সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন, জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশ—এই তিনটি ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
প্রয়োজনে এটিকে আরও দীর্ঘ, সংবাদপত্রের বিশেষ প্রতিবেদনধর্মী (১২০০–১৫০০ শব্দ) সংস্করণেও রূপান্তর করা যেতে পারে।

