গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে সামরিক বিমানে তুলে দেওয়ার পরও শেষ মুহূর্তে কেন সেই বিমানে আর ওঠেননি তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী?— এ প্রশ্ন এখনো স্পষ্টভাবে অমীমাংসিত।
সামরিক ও নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পরিবারের সদস্যদের ভারতে পাঠিয়ে তিনি দেশে থেকে যান এবং পরদিন ভিন্ন পথে দেশ ছাড়েন। তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনের কারণ সম্পর্কে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থার বিস্তারিত প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের উচ্চপর্যায়ে সরবরাহ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত সময়ে ৩৬ জুলাইয়ের দিন যখন ছাত্র-জনতার রক্তে রাজপথ রঞ্জিত, তখন দুপুরের আগেই দেশের আকাশসীমা ছেড়ে যান শেখ হাসিনা। জনরোষ থেকে বাঁচতে সামরিক বিমানে দেশত্যাগের সেই উদ্বেগময় যাত্রায় তার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, বিমানে থাকা সহযাত্রী, ক্রু কিংবা নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে তিনি কী কথা বলেছিলেন, তাকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়া কর্মকর্তারা এখন কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা।
সাবেক ও বর্তমান সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে শেখ হাসিনার ভারত যাত্রা সম্পর্কে বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে সশস্ত্র বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি স্পর্শকাতর কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও সেগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
৫ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে পুলিশের গুলি উপেক্ষা করে জনস্রোত গণভবনের দিকে এগিয়ে যায়। দুপুরের আগেই পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কায় শেখ হাসিনাকে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে গণভবন ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এরপর বাণিজ্যমেলার কাছাকাছি এলাকায় বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার (এমআই-১৭) অবতরণ করে। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে হেলিকপ্টারটি পূর্বনির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশে উড্ডয়ন করে।
সূত্র জানায়, গণভবন থেকে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে সরিয়ে নেওয়া হেলিকপ্টারের পাইলট ছিলেন এয়ার কমোডর আব্বাস এবং কো-পাইলট ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির। বিকেল ৩টার দিকে হেলিকপ্টারটি কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে অবতরণ করে।
এ সময় তেজগাঁও বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকারী উইং কমান্ডার কানিজ ফাতেমা সংক্ষিপ্ত বেতার বার্তার মাধ্যমে রেসকিউ মিশনের আওতায় সামরিক হেলিকপ্টার উড্ডয়নের তথ্য ঢাকা ট্রাফিক কন্ট্রোলকে জানান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরপরই এয়ার কমোডর আব্বাসকে একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিতে পাকিস্তানে পাঠানো হয়। নির্ধারিত সময় শেষে তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং পরে নিয়মিত দায়িত্ব পান। বর্তমানে তিনি বিমানবাহিনী সদর দপ্তরের এয়ার হেডকোয়ার্টার ইউনিটের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
অন্যদিকে হেলিকপ্টারের কো-পাইলট গ্রুপ ক্যাপ্টেন রায়হান কবির বর্তমানে বাশার এয়ার বেইজে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পুরো বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। বিশেষ করে তাকে গণভবন থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা সম্পর্কে মাত্র কয়েকজন বিশ্বস্ত সেনা কর্মকর্তাই অবগত ছিলেন। অভিযান বাস্তবায়নে বিমানবাহিনীর বিশেষ উড্ডয়ন ইউনিটকে যুক্ত করা হয়।
এ ছাড়া শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে গ্রহণ করতে কুর্মিটোলা এয়ার বেইজের তৎকালীন কমান্ডারও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
নিরাপত্তা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে আগে থেকেই ইঞ্জিন চালু অবস্থায় একটি সামরিক পরিবহণ বিমান (সি-১৩০ জুলিয়েট) প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। ওই বিমানের ভেতরে অবস্থান করছিলেন শেখ হাসিনার তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয় মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিকী, তার স্ত্রী শাহিন সিদ্দিকী, তাদের দুই কন্যা এবং জামাতা।
হেলিকপ্টার থেকে নেমে শেখ হাসিনা সেখানে উপস্থিত কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা বলেন। তিনি দেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান। এ সময় তাকে গণভবনের দিকে এগিয়ে যাওয়া জনস্রোত এবং অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি সম্পর্কে সংক্ষেপে জানানো হয়।
এর ফলে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়েই শেখ হাসিনা তার দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের শাসনের অবসানের বিষয়টি জানতে পারেন।
তবে আরেকটি সামরিক সূত্রের দাবি, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলেও কোনো এক অজ্ঞাত কারণে তারিক সিদ্দিকী নিজে ওই বিমানে ওঠেননি। পরদিন তিনি গোপনে চট্টগ্রামে যান এবং একপর্যায়ে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে নৌপথে দেশ ছাড়েন।
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর তারিক সিদ্দিকীকে দেশত্যাগে সহায়তার অভিযোগে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তৎকালীন চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েলকে গ্রেফতার করা হয়।
সূত্র জানায়, শেখ হাসিনাকে ভারত পাঠানোর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিমানবাহিনীর পরিবহণ বিমানটির ককপিটে আগে থেকেই পাইলট ও কো-পাইলট নিজ নিজ আসনে অবস্থান করছিলেন। পাইলটের দায়িত্বে ছিলেন এয়ার কমোডর শামীম রেজা এবং কো-পাইলটের দায়িত্বে ছিলেন উইং কমান্ডার মাহফুজ।
বিমানটি ৫ আগস্ট বিকেল ৬টা ১৫ মিনিটে ভারতের দিল্লির উপকণ্ঠে অবস্থিত হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে।
তবে নিরাপত্তার অংশ হিসেবে উড্ডয়নের সময় বিমানটির ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা হয়েছিল। প্রচলিত আকাশপথ ব্যবহার না করে কিছুটা ভিন্ন রুটে বিমানটি দিল্লির উদ্দেশে যাত্রা করে। ফলে বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করার আগ পর্যন্ত বিমানটির অবস্থান রাডারে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ভারতের আকাশসীমায় প্রবেশের পর পাইলট কলকাতা বিমানবন্দরের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের (এটিসি) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ভারতে অবতরণের পর দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালসহ কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তা শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান।
সূত্র জানায়, শেখ হাসিনাকে নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার পর ক্রু সদস্য ও নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ে বিমানটি আবার ঢাকায় ফিরে আসে। পরে পাইলট এয়ার কমোডর শামীম রেজাকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক প্রশিক্ষণ কোর্সে অংশ নিতে ফিলিপাইনে পাঠানো হয়।
তবে কো-পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী উইং কমান্ডার মাহফুজ বর্তমানে বিমানবাহিনীর গোয়েন্দা পরিদপ্তরে কর্মরত রয়েছেন।
একটি সামরিক সূত্র জানায়, গণভবন থেকে শেখ হাসিনাকে সরিয়ে নেওয়ার অভিযান মূলত দুটি ধাপে পরিচালিত হয়েছিল। প্রথম ধাপে হেলিকপ্টারে করে তাকে নিরাপদে কুর্মিটোলা এয়ার বেইজে নেওয়া হয়। এরপর সেখান থেকে সামরিক বিমানে করে ভারতে পৌঁছে দেওয়ার পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
সূত্রের দাবি, এই উদ্ধার অভিযানের সার্বিক দায়িত্বে ছিলেন বিমানবাহিনীর তৎকালীন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা গ্রুপ ক্যাপ্টেন আবু সালেহ মান্নাফি। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের তৎকালীন সহসভাপতি আবু আহমেদ মান্নাফির ছেলে।
৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আবু আহমেদ মান্নাফি নিজেও সেনানিবাসে আশ্রয় নেন। সে সময় তার সঙ্গে ছোট ছেলে ও সিটি করপোরেশনের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর গৌরবসহ পরিবারের সদস্যরা ছিলেন।
পরে তাদের বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য নির্ধারিত সরকারি আবাসন এলাকা চন্দ্রিকায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি ফ্ল্যাটে তারা দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগ এবং উদ্ধার অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব ও আইনি অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ও সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর (অব.) এম সরোয়ার হোসেন মঙ্গলবার বলেন, আইন অনুযায়ী কোনো রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান পদত্যাগ করার পরও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ) নিরাপত্তা পেয়ে থাকেন।
তিনি বলেন, পদত্যাগের পর শেখ হাসিনার ভারতে চলে যাওয়ার ঘটনায় তার নিরাপত্তায় নিয়োজিত এসএসএফ সদস্য এবং সামরিক কর্মকর্তারা মূলত তাদের ওপর অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ক্ষেত্রে তারা কোনো বেআইনি কাজ করেননি।
তবে তিনি আরও বলেন, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সে সময় ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে যে কেউ আটক করে আইনের আওতায় নিতে পারতেন। তার মতে, সেটিই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতো।
সূত্র: যুগান্তর

