বিবিসি বাংলা—
গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যাওয়ার দুই বছর পর যখন শেখ হাসিনা আবার বাংলাদেশে ফেরার কথা বলছেন, ঠিক সেই সময়েই দেশে তার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বিচারের প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে, গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশে ফেরার বিষয়ে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তবে বাংলাদেশের আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে সংগঠনটির বিচার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের সুযোগ তৈরি করে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোর দাবির পর নির্বাহী আদেশে দেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, একটি দলের অভিযোগের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম চলছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩, রোম স্ট্যাটিউট এবং সন্ত্রাস দমন আইন বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে।
আমিনুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সংগঠনটির সব কার্যক্রম তদন্তের আওতায় পর্যালোচনা করা হবে। যদি সংগঠন হিসেবে কোনো মানবতাবিরোধী অপরাধে দলটির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় অথবা সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে কোনো ভূমিকার প্রমাণ মেলে, তাহলে সংগঠনটিকে বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
দল নিষিদ্ধের বিষয়ে মতভেদ
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার করে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপিসহ জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মো. রাশেদ খান, যিনি জাতীয় নির্বাচনের আগে গণঅধিকার পরিষদের নেতা ছিলেন, তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের রাজনীতি আর সম্ভব নয় এবং দলটি আর ফিরে আসতে পারবে না।
তিনি বলেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চলমান রয়েছে।
তবে ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দলের বিচার এবং নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ বাংলাদেশে নজিরবিহীন। এর আগে আদালতের রায়ের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনা দেশে ঘটেনি। অবশ্য নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক দল বা সংগঠন নিষিদ্ধ করার উদাহরণ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগমুহূর্তে জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।
বাংলাদেশে বিচারিক প্রক্রিয়ায় কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের নজির না থাকলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এমন উদাহরণ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এসব দৃষ্টান্ত তুলে ধরে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এখনো যদি নাৎসি মতাদর্শের কোনো দল মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে, তাহলে সেটিও নিয়ন্ত্রণ ও দমন করা হয়।
মাহবুব উল্লাহ বলেন, আওয়ামী লীগ পাকিস্তান আমলেও অত্যন্ত সহিংস আচরণ করেছে। একটি রাজনৈতিক দল রাজনীতির মাঠ থেকে হারিয়ে যাবে—এটি ভাবা যেমন কষ্টের, তার চেয়েও বেশি কষ্টের বিষয় হলো দলটি কী করেছে, কী ধরনের অনাচার, অবিচার ও নির্যাতন করেছে এবং মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ জীবন নিয়ে কীভাবে ছেলেখেলা করেছে।
তিনি বলেন, মানুষের জীবনকে তুচ্ছ করে দেখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর।
অন্যদিকে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগের কথা বিবেচনায় নিয়ে কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিরোধিতা করে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক মান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। ফলে ট্রাইব্যুনালে কোনো রাজনৈতিক দলের বিচার দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও গ্রহণযোগ্য করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
সাবেক বিচারপতি ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মো. মনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, আগে কোনো রাজনৈতিক দলের বিচারের বিষয়টি আইনে ছিল না। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইন সংশোধন করে এ সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে ২০(বি) নামে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। তার মতে, ধারাটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে যুক্ত করা হয়েছে।
আইন সংশোধনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে রাজনৈতিক দলের বিচার করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে।
মনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, কোনো দলের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে যদি দলগতভাবে কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে এবং সেই অপরাধ মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে, তাহলে ট্রাইব্যুনালকে দেওয়া ক্ষমতা প্রয়োগ করা যেতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে, তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা যুক্তিসংগত হবে না।
তার মতে, দল হিসেবে বিচার এবং নিষিদ্ধ করার বিষয়টি শুধু আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্বে যারা রয়েছেন, তাদের বিবেচনা করতে হবে এই সিদ্ধান্ত কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং এমন পদক্ষেপ নেওয়া কতটা উপযুক্ত। কারণ রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জনসমর্থন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি বড় রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে রাজনীতি করার সুযোগ বন্ধ করে দিলে দলের সমর্থকেরা সেটি গ্রহণ করবেন কি না, তা ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে।
মনসুরুল হক চৌধুরী মনে করেন, ট্রাইব্যুনাল আইন বা সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কোনো দলের বিচার করতে হলে প্রমাণ করতে হবে যে দলীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তবে বিষয়টি প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, নীতিগতভাবে তিনি কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন।
তার মতে, কোনো ব্যক্তির অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু একটি বড় রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হলে তা গণতন্ত্র এবং সংবিধানের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সমর্থন পাওয়ার বিষয়ে জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, তদন্ত যদি যথাযথ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা হয়, তাহলে এর বিরোধিতা করার নৈতিক যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে।
তিনি বলেন, তদন্ত অবশ্যই নির্ভুল ও পক্ষপাতহীন হতে হবে। তদন্তের ফলাফল যে সত্য, তা প্রমাণ করার জন্য প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনমত তৈরি করাও জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পর নির্বাচন কমিশন দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে। এর ফলে গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি অংশ নিতে পারেনি।
পরবর্তীতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ-সংক্রান্ত অধ্যাদেশে কিছু সংশোধনী আনা হয় এবং তা ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস করা হয়।
বিলটি পাসের সময় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এটি একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠন নিষিদ্ধ করার বিষয়ে সংশোধনী। আগের আইনে পরিবর্তন আনার জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের আন্দোলনের পর এ বিষয়ে জনমত তৈরি হয়েছিল। সেই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশনে দলটির নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে।
তিনি আরও জানান, সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংগঠনটির বিচারের সুযোগ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে।

