উপকূলীয় জেলা বরগুনার প্রায় বারো লাখ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র বড় ভরসা হলো আড়াইশ শয্যার বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এই হাসপাতালটি চলছে জনবলের চরম অভাবে। মঞ্জুরিকৃত একাশি জন চিকিৎসকের জায়গায় বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র পনেরো জন, যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই অপ্রতুল।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, পঞ্চান্নটি মেডিকেল অফিসার পদের মধ্যে সাতচল্লিশটিই খালি পড়ে আছে। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অবস্থা আরও করুণ—সতেরোটি কনসালট্যান্ট পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন কেবল দুজন।
এই জনবল–সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবায়। সামান্য জটিল কোনো রোগ ধরা পড়লেই রোগীদের পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে বরিশাল অথবা রাজধানীর হাসপাতালে। এতে একদিকে যেমন চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, তেমনি রোগী ও তাঁদের স্বজনদের পাড়ি দিতে হচ্ছে দীর্ঘ পথ, সহ্য করতে হচ্ছে বাড়তি কষ্ট।
মেডিসিন, সার্জারি, স্ত্রীরোগ, শিশুরোগ, অর্থোপেডিকস, চোখ, নাক-কান-গলা এবং অ্যানেসথেসিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলোতেও নেই পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞ। ফলে অনেক প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার এই হাসপাতালে নিয়মিতভাবে করা যাচ্ছে না। জটিল রোগীদের পাঠাতে হচ্ছে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা ঢাকার বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে।
চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাঁদের স্বজনরা জানান, চিকিৎসক কম থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। সামান্য সমস্যা দেখা দিলেই তাঁদের রেফার করে দেওয়া হচ্ছে অন্য হাসপাতালে।
বরগুনা সদর উপজেলার এক এলাকার বাসিন্দা এক ব্যক্তি বলেন, সরকারি হাসপাতালে এসেও যদি বরিশাল যেতে হয়, তাহলে দরিদ্র মানুষের কষ্টের যেন শেষ নেই। চিকিৎসকের ঘাটতির কারণে প্রতিনিয়ত তাঁদের ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
সন্তানসম্ভবা এক রোগীর এক স্বজন জানান, স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ না থাকায় জরুরি প্রসূতি রোগীদেরও প্রায়ই বাইরের হাসপাতালে পাঠানো হয়, যা ঝুঁকিপূর্ণ রোগীর জীবনের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় একটি স্বাস্থ্য অধিকারবিষয়ক সংগঠনের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি মন্তব্য করেন, একটি জেলা হাসপাতালে এমন ভয়াবহ চিকিৎসক–সংকট অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তাঁর মতে, শূন্য পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ এবং উপকূলীয় প্রান্তিক এলাকায় কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা চালু করা জরুরি।
স্থানীয় এক সাংবাদিক বলেন, জেলার মানুষ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সামান্য জটিলতাতেই রোগীদের অন্যত্র পাঠানো হচ্ছে, আর স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন।
হাসপাতালের একজন আবাসিক সার্জন জানান, চিকিৎসক–সংকটের কারণে বহির্বিভাগে একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন দেড়শ থেকে দুইশ রোগী দেখতে হচ্ছে। এত রোগীর চাপে প্রত্যেককে যথাযথ সময় দেওয়া আদৌ সম্ভব হয় না।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা বলেন, এত বিপুল রোগীর চাপ মাত্র দুজন বিশেষজ্ঞ দিয়ে সামলানো একেবারেই অসম্ভব। বিষয়টি লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং সংকট নিরসনে সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তিনি আরও জানান, ২০১০ সালে হাসপাতালটিকে একশ শয্যা থেকে বাড়িয়ে আড়াইশ শয্যায় উন্নীত করা হলেও, সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ও জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ছয়শোর বেশি রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন, আর অন্তর্বিভাগে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নেন সাড়ে তিনশোর বেশি রোগী। এত বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ সামলাতে হাতে গোনা কয়েকজন চিকিৎসককে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে।
জেলার সিভিল সার্জন বলেন, বরগুনায় চিকিৎসক–সংকট বাস্তব সমস্যা। শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগের জন্য প্রতি মাসেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হচ্ছে এবং ধাপে ধাপে নতুন চিকিৎসক পদায়ন হলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জানান, নতুন চিকিৎসক নিয়োগ সম্পন্ন হলে এই সংকট আর থাকবে না এবং তখন রোগীরা কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা পাবেন।
সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, অবকাঠামো বাড়লেও জনবল না বাড়ায় বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল কার্যত তার সক্ষমতার অনেক নিচে সেবা দিতে বাধ্য হচ্ছে। দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগ ও প্রান্তিক এলাকার জন্য বিশেষ প্রণোদনা ছাড়া এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেওয়ার আশঙ্কাই থেকে যাচ্ছে।

