ঢাকায় কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি এখন আর শুধু একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা নয়। অনেক এলাকার মানুষের কাছে বৃষ্টি মানেই রাস্তায় পানি, যানজট, বন্ধ হয়ে যাওয়া চলাচল, বাসাবাড়ি ও দোকানে পানি ঢোকা এবং কয়েক ঘণ্টার জন্য পুরো নগরজীবন স্থবির হয়ে পড়া। এমনকি মাঝারি মাত্রার বৃষ্টিতেও রাজধানীর বহু এলাকা যখন হাঁটু কিংবা কোমরসমান পানিতে তলিয়ে যায়, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—সমস্যাটি কি সত্যিই অতিরিক্ত বৃষ্টির, নাকি বৃষ্টির পানি সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলেছে ঢাকা?
সাম্প্রতিক সময়ে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য জেলাগুলোতে বন্যায় প্রাণহানি এবং বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতির ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে ঢাকার মানুষকেও আবার জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ সামলাতে হয়েছে। কিন্তু এই দুটি ঘটনাকে একই চোখে দেখলে সমস্যার আসল কারণ বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ বন্যা ও জলাবদ্ধতা দেখতে কাছাকাছি মনে হলেও তাদের উৎপত্তি, প্রকৃতি এবং সমাধানের পথ এক নয়।
ঢাকায় ২০২১, ২০২৩, ২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বড় ধরনের জলাবদ্ধতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার দিনে বৃষ্টিপাত ছিল ৭১ থেকে ১৯৬ মিলিমিটারের মধ্যে। অর্থাৎ প্রতিবারই অস্বাভাবিক রেকর্ডভাঙা বৃষ্টি হয়নি। বরং নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এমন অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে মাঝারি কিংবা স্বাভাবিক মাত্রার বৃষ্টিও অনেক জায়গায় গুরুতর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করতে সক্ষম।
এ কারণেই ঢাকার বর্তমান সংকট বোঝার জন্য শুধু আকাশের দিকে তাকালে চলবে না। তাকাতে হবে মাটির দিকে, খালের দিকে, জলাধারের দিকে, সড়কের নিচের নালার দিকে এবং সবচেয়ে বেশি তাকাতে হবে গত কয়েক দশকের নগর পরিকল্পনার দিকে।
বন্যা আর জলাবদ্ধতা কেন এক নয়
বন্যা একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। নদীর পানি বেড়ে নদীর আশপাশের প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়া বিশ্বের বহু নদী ব্যবস্থার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। নির্দিষ্ট বিরতিতে নদীর পানি প্লাবনভূমিতে প্রবেশ করে পলি জমায়, মাটির উর্বরতা বাড়ায় এবং নদীকেন্দ্রিক প্রতিবেশকে সচল রাখে।
বাংলাদেশের বড় অংশই প্রধান নদী ও তাদের শাখা-প্রশাখার প্লাবনভূমির অংশ। ফলে এখানে নদী ও প্লাবনের সম্পর্ক অত্যন্ত স্বাভাবিক। সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন মানুষ নদীর স্বাভাবিক বিস্তারের জায়গা দখল করে বসতি, সড়ক, শিল্প, আবাসন কিংবা অন্য অবকাঠামো নির্মাণ করে।
অন্যদিকে জলাবদ্ধতা ঘটে তখন, যখন বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিচু জমি, নালা, খাল কিংবা নদীতে পৌঁছাতে পারে না। অর্থাৎ পানি আছে, কিন্তু পানি বের হওয়ার পথ নেই।
সড়ক, ভবন, উঁচু বাঁধ, ভরাট করা জলাভূমি, সংকুচিত খাল, অপরিকল্পিত আবাসন, বন্ধ নালা এবং ভুল জায়গায় নির্মিত অবকাঠামো বৃষ্টির পানির স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দেয়। ফলে পানি একটি এলাকায় জমতে শুরু করে এবং সেই পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে তৈরি হয় জলাবদ্ধতা।
ঢাকার সমস্যাটি মূলত এখানেই।
পানি শোষণের ক্ষমতা হারিয়েছে ঢাকা
একসময় বৃষ্টির বড় একটি অংশ মাটিতে শোষিত হতো। খোলা জমি, নিচু এলাকা, জলাভূমি, পুকুর, খাল এবং গাছপালায় আচ্ছাদিত ভূমি পানি ধরে রাখত। নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে এসব জায়গার বড় অংশ কংক্রিট, ইট, সড়ক এবং ভবনের নিচে চলে গেছে।
ফলে বৃষ্টির পানি মাটির ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পাচ্ছে না। পানি সরাসরি রাস্তায় নেমে আসছে এবং দ্রুত নিচু এলাকায় জমা হচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো জলাধার এলাকার পানি না শোষা শক্ত পৃষ্ঠের পরিমাণ ২০ শতাংশ বাড়লে বন্যার মাত্রা ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
ঢাকার পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বাংলাশাল, সূত্রাপুর, কলাবাগান, হাজারীবাগ, মিরপুর ও রামপুরার মতো কয়েকটি এলাকায় পানি না শোষা শক্ত পৃষ্ঠের পরিমাণ ৯০ শতাংশের বেশি হয়ে গেছে। এর অর্থ, এসব এলাকায় বৃষ্টির প্রায় পুরো পানিই মাটিতে প্রবেশ না করে উপরিভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয়।
এটি নগর জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ।
১৯৮০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার নির্মিত এলাকার পরিমাণ সাত গুণ বেড়েছে। একই সময়ে শহরের প্রায় ৬০ শতাংশ জলাভূমি ও জলাশয় হারিয়ে গেছে।
এই দুটি তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করলে সমস্যাটি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। একদিকে বৃষ্টির পানি শোষণের জায়গা কমেছে, অন্যদিকে পানিকে সাময়িকভাবে ধরে রাখার প্রাকৃতিক জলাধারও হারিয়ে গেছে।
ফলে বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ পানি নালা, খাল ও নিচু এলাকার দিকে ছুটতে থাকে। আগে যে পানি ধীরে ধীরে প্রবাহিত হতো, এখন সেই পানি একসঙ্গে জমা হচ্ছে।
ঢাকায় বৃষ্টি বেড়েছে, কিন্তু সেটিই একমাত্র কারণ নয়
১৯৯১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ঢাকায় বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১,২০০ থেকে ৩,০০০ মিলিমিটারের মধ্যে ছিল।
২০২২ সালের একটি গবেষণায় ১৯৯১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ঢাকায় মোট ৭০টি জলাবদ্ধতার ঘটনা শনাক্ত করা হয়। এর মধ্যে ২০০৪ ও ২০০৯ সালের ২টি ঘটনাকে গুরুতর এবং আরও ১৪টিকে বড় ধরনের জলাবদ্ধতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জলাবদ্ধতার ঘটনা সময়ের সঙ্গে দ্রুত বাড়ছে।
২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মাত্র পাঁচ বছরে ৪২টি জলাবদ্ধতার ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে ৮.৪টি ঘটনা।
অন্যদিকে ১৯৯১ থেকে ২০১৭ সালের দীর্ঘ সময়ে ঘটেছিল ২৮টি ঘটনা, যা বছরে গড়ে মাত্র ১.১২টি।
এর অর্থ, সমস্যা শুধু বৃষ্টির পরিমাণের নয়। একই শহরে জলাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
২০০৪ সালের বড় জলাবদ্ধতার সময় মোট বৃষ্টি হয়েছিল ৩৪১ মিলিমিটার। ২০০৯ সালের ঘটনায় বৃষ্টির পরিমাণ ছিল ৩৩৩ মিলিমিটার। এত বেশি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
কিন্তু ২০১৩ সালের ঘটনাটি অন্য বার্তা দেয়।
সেবার মাত্র ৫৬ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই বড় ধরনের জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছিল। কারণ প্রতি ঘণ্টায় বৃষ্টির তীব্রতা পৌঁছেছিল ২৮ মিলিমিটারে।
পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঢাকায় প্রায় ১০ ঘণ্টায় ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিও বড় ধরনের জলাবদ্ধতা তৈরির জন্য যথেষ্ট হতে পারে।
এখানেই মূল পার্থক্য। বৃষ্টির পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও একটি নগর কত দ্রুত সেই পানি সরিয়ে নিতে পারে, সেটিই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করে শহর ডুববে কি না।
জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের ঝুঁকি আরও বাড়াবে
দক্ষিণ এশিয়ায় ভবিষ্যতে বর্ষার মোট বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে বলে আন্তর্জাতিক জলবায়ু মূল্যায়নগুলোতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অল্প সময়ে খুব বেশি বৃষ্টিপাত, কয়েক দিনের মধ্যে ভারী বর্ষণ এবং বছরভেদে বৃষ্টির বড় পার্থক্য বাড়তে পারে।
অর্থাৎ ঢাকার বিদ্যমান পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার দুর্বলতা যদি এখনই ঠিক করা না হয়, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন এখানে মূল সমস্যার একমাত্র কারণ নয়; বরং আগে থেকেই দুর্বল নগর ব্যবস্থার ওপর এটি বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
কোন এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে
ঢাকার জলাবদ্ধতা সব এলাকায় সমান নয়।
পশ্চিমাঞ্চলের মিরপুর-১০, শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, কলাবাগান, ধানমন্ডি, শাহজাহানপুর, খিলগাঁও, রামপুরা, মতিঝিল, নিউ মার্কেট, আজিমপুর, লালবাগ, চকবাজার ও বাংলাশাল এলাকায় জলাবদ্ধতার প্রবণতা বেশি।
গাবতলী থেকে সদরঘাট পর্যন্ত পশ্চিমাঞ্চলীয় বাঁধ থাকা সত্ত্বেও পশ্চিম ঢাকার বহু এলাকায় জলাবদ্ধতা এখনো নিয়মিত ঘটনা।
১৯৯১ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে প্রায় ৩০০টি স্থানে জলাবদ্ধতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ২০০৪ সালের ঘটনাতেই প্রায় ৫৫টি স্থান এবং ২০০৯ সালে প্রায় ৩০টি স্থান পানিতে তলিয়ে যায়।
ভৌগোলিক তথ্য ও দূর অনুধাবনভিত্তিক একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ জলাবদ্ধতার জন্য তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। শহরের প্রায় ৩৫ শতাংশ এলাকা উচ্চ থেকে অতি উচ্চ ঝুঁকির অঞ্চলের মধ্যে পড়ে।
১৯৯১ সাল পর্যন্ত জলাবদ্ধতা মূলত পশ্চিম ঢাকার সমস্যা হিসেবে দেখা গেলেও ২০১৩ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে এর বিস্তার উত্তর ও পূর্ব দিকেও বেড়েছে।
বুয়েট-শহীদ মিনার এলাকা, সিদ্ধেশ্বরী-মগবাজার, মিরপুর-১০, মিরপুরের প্রশিকা এলাকা, সাতমসজিদ, শ্যামলী এবং রামপুরা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকার মধ্যে রয়েছে।
এতে বোঝা যায়, সমস্যা ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট কিছু পুরোনো এলাকা থেকে পুরো নগর ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ছে।
ঢাকার পানি আসলে কোন পথে যেতে চায়
ঢাকার জলাবদ্ধতা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো ভূমির উচ্চতার ভিত্তিতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বিশ্লেষণ করা।
ভূমির উচ্চতার সংখ্যাভিত্তিক মানচিত্র ব্যবহার করে বোঝা যায়, বৃষ্টি হলে কোন স্থান দিয়ে পানি গড়িয়ে যাবে এবং কোথায় গিয়ে জমবে। নিচু জায়গা এবং স্বাভাবিক প্রবাহপথগুলোই সাধারণত বেশি পানি গ্রহণ করে।
কিন্তু ঢাকার ক্ষেত্রে একটি বড় অসঙ্গতি দেখা গেছে।
বর্তমান পানি জমার স্বাভাবিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গে অনেক বিদ্যমান কিংবা বিলুপ্ত খালের অবস্থান মিলছে না।
এর কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভূমি ভরাট, অবকাঠামো নির্মাণ এবং অবৈধ দখলের মাধ্যমে অনেক এলাকার উচ্চতা বদলে গেছে। কোথাও খাল ভরাট হয়েছে, কোথাও সংকুচিত হয়েছে। ফলে যে খাল একসময় সবচেয়ে নিচু জায়গায় ছিল, সেটি হয়তো এখন আর আশপাশের সবচেয়ে নিচু স্থান নয়।
কিছু খালের মানচিত্রে অবস্থান কিংবা প্রবাহের দিকও বাস্তব অবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি না-ও মিলতে পারে।
নারাই খালকে মানচিত্রে পূর্ব ঢাকার অন্যতম বড় প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা হিসেবে দেখা গেলেও বর্তমান ভূমির উচ্চতা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, পূর্বাঞ্চলের বড় অংশের পানি আসলে জামির খালের দিকে জমা হওয়ার প্রবণতা দেখায়।
নারাই খালের একটি অংশ উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত বলে দেখানো হলেও বর্তমান ভূমির ঢাল অনুযায়ী এর পশ্চিমাংশের পানি জামির খালের দিকেই যাওয়ার কথা।
এই বিশ্লেষণে ব্যবহৃত ভূমি উচ্চতার তথ্যের প্রতিটি ঘর ছিল ৩০ মিটার বাই ৩০ মিটার। আরও সূক্ষ্ম তথ্য ব্যবহার করা গেলে বাস্তব পানি প্রবাহের ছবি আরও নির্ভুলভাবে পাওয়া সম্ভব।
বাঁধ, পাম্প ও স্লুইস থাকার পরও সমস্যা কেন
ঢাকায় জলাবদ্ধতা কমাতে বছরের পর বছর বাঁধ, স্লুইসগেট, বন্যা প্রতিরোধ দেয়াল এবং পাম্পিং ব্যবস্থা নির্মাণ করা হয়েছে।
তারপরও সমস্যা কমেনি।
এখানে বড় প্রশ্ন হলো—এসব অবকাঠামো কি সঠিক জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে?
পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনেক স্লুইসগেট এমন জায়গায় রয়েছে যেখানে বড় জলাধার এলাকা থেকে সর্বাধিক পানি জমা হয় না।
পাম্পিং ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন ওঠে।
কল্যাণপুরের পাম্পিং ব্যবস্থা তুলনামূলক বড় একটি জলাধার এলাকার পানি সংগ্রহ করে। কিন্তু বনশ্রী-নারাই অঞ্চলের পাম্প কিংবা কল্যাণপুরের উত্তরের আরেকটি পাম্পের অবস্থান পানির স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা স্পষ্ট নয়।
পাম্প দিয়ে পানি সরানো জরুরি পরিস্থিতিতে কাজে লাগতে পারে। কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়।
একটি বড় বৃষ্টির ঘটনায় যে পরিমাণ পানি তৈরি হয়, অনেক ক্ষেত্রেই বিদ্যমান পাম্প সেই পানি সরানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
জরুরি পাম্প দরকার হলে তা এমন স্থানে বসাতে হবে যেখানে একটি জলাধার এলাকার স্বাভাবিক পানি প্রবাহ শেষ হয়। পাশাপাশি পাম্পের ক্ষমতাও সংশ্লিষ্ট এলাকার সম্ভাব্য পানির পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
বর্তমান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকার বড় অংশের উপরিভাগের পানি জামির খাল জলাধার এলাকায় তৈরি হয়। এর মধ্যে উত্তরা-হাজি ক্যাম্প, মাটিকাটা, বাড্ডা এবং বেগুনবাড়ি-হাতিরঝিলের মতো কয়েকটি ছোট জলাধার অঞ্চল রয়েছে।
নারাই খাল, কল্যাণপুর খাল এবং বাউনিয়া খাল এলাকাও বিপুল পানি তৈরি করে।
ঢাকার সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধ এলাকাগুলোর বড় অংশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-ঢাকা মেডিকেল-বুয়েট, বেগুনবাড়ি-হাতিরঝিল, সিদ্ধেশ্বরী এবং বাড্ডা জলাধার অঞ্চলের মধ্যে পড়ে।
রাস্তা নিজেই যখন পানির বাঁধ
ঢাকার অনেক সড়ক স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বিবেচনা না করেই নির্মাণ করা হয়েছে।
কোনো নিচু প্রবাহপথের ওপর যদি রাস্তা তৈরি হয় এবং প্রয়োজনীয় কালভার্ট বা সেতু না রাখা হয়, তাহলে সেই রাস্তা কার্যত বাঁধে পরিণত হয়।
বৃষ্টি হলে পানি রাস্তার এক পাশে জমতে থাকে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৭৮ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ঢাকার নির্মিত এলাকার পরিমাণ ২২.১ শতাংশ বেড়েছে।
একই সময়ে অত্যন্ত বেশি উপরিভাগের পানি তৈরি করে এমন এলাকার পরিমাণ ৭৪.২৪ বর্গকিলোমিটার থেকে বেড়ে ১৭৪.২৩ বর্গকিলোমিটারে পৌঁছেছে।
এ পরিবর্তন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ যত বেশি এলাকা কংক্রিটে ঢাকা পড়ছে, তত বেশি বৃষ্টির পানি সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় নেমে আসছে।
ঢাকার নালা ব্যবস্থার অবস্থাও ভালো নয়। বহু নালা প্রয়োজনের তুলনায় ছোট, আবার অনেক নালা ময়লা-আবর্জনায় আটকে থাকে।
জাগোনিউজ২৪-এর ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, শহরের মাত্র ১০ শতাংশ বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নালা কার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
অন্যদিকে প্রাকৃতিক খালগুলোও দখল ও ভরাটের শিকার হয়েছে।
বৃহত্তর ঢাকায় ১৯৯০-এর দশকে কৃষিজমির পরিমাণ ছিল ৮০ শতাংশের বেশি। ২০১০ সালের মধ্যে তা ১০ শতাংশের নিচে নেমে আসে।
এই সময়ে নির্মিত এলাকার বিস্তার ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
শুধু খাল উদ্ধার করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে
খাল উদ্ধার অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু পুরোনো খাল দখলমুক্ত করলেই পুরো সমস্যার সমাধান হবে না।
কারণ যে সময় এসব খাল স্বাভাবিকভাবে তৈরি হয়েছিল, তখন ঢাকায় এত ভবন, রাস্তা ও কংক্রিটের পৃষ্ঠ ছিল না।
বর্তমানে একই পরিমাণ বৃষ্টিতে আগের তুলনায় অনেক বেশি উপরিভাগের পানি তৈরি হয়।
তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সম্ভাব্য বাড়তি বর্ষণ।
ফলে পুরোনো খালগুলো উদ্ধার করার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আরও প্রশস্ত ও গভীর করতে হবে।
সরকারের ২০১৬ সালের পরিকল্পনায় পূর্ব ঢাকার ১৩টি খালের মোট ৫০.৭৫ কিলোমিটার খননের কথা ছিল। এর মধ্যে শাহজাদপুর, সুতিভোলা, বেগুনবাড়ি, মান্ডা ও জিরানি খাল রয়েছে।
এ ছাড়া কাতাসুর, আবদুল্লাহপুর, বাউনিয়া, বাইশটেকি ও শাহজাহানপুরসহ আরও কয়েকটি খালের মোট ৩৪.৪২ কিলোমিটার অংশও পরিকল্পনার মধ্যে ছিল।
কিন্তু শুধু পুরোনো মানচিত্র অনুসরণ করে খাল খনন করলেই হবে না।
বর্তমানে যেখানে বাস্তবে পানি জমছে, সেই নিচু প্রবাহ অঞ্চলগুলোর সঙ্গে খালের সংযোগ তৈরি করতে হবে।
পুরো ঢাকাকে ছোট ছোট জলাধার অঞ্চলে ভাগ করে ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন
জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় ঢাকাকে প্রশাসনিক সীমানা দিয়ে নয়, পানির স্বাভাবিক প্রবাহের ভিত্তিতে দেখতে হবে।
কোন এলাকার বৃষ্টির পানি কোন দিকে যায়, কোথায় জমে এবং শেষ পর্যন্ত কোন খাল বা নদীতে গিয়ে পড়ে—এই হিসাব ধরে পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
বর্তমানে ঢাকার মাত্র ৩৮ শতাংশ এলাকা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নালার আওতায় রয়েছে। কার্যকর নগর পানি ব্যবস্থার জন্য এই হার ১০০ শতাংশে নেওয়া প্রয়োজন।
প্রতিটি ছোট জলাধার অঞ্চলকে প্রথমে আলাদা পানি ব্যবস্থাপনা একক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
ছোট এলাকার পানি স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ ও নিষ্কাশনের পর সেটিকে ধাপে ধাপে বড় জলাধার অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
নালার অবস্থানও সড়ক কিংবা জমির মালিকানার সুবিধামতো নয়, বরং ভূমির স্বাভাবিক ঢাল অনুসরণ করে নির্ধারণ করতে হবে।
জলাবদ্ধ এলাকার সড়কে বড় কালভার্ট ও সেতু দরকার
যেসব সড়ক প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ অতিক্রম করেছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট জলাধার এলাকার আকার অনুযায়ী কালভার্ট কিংবা সেতু থাকতে হবে।
ছোট একটি পাইপ দিয়ে বড় এলাকার পানি সরানো সম্ভব নয়।
পান্থপথের বাক্স আকৃতির কালভার্টটি সরিয়ে আরও প্রশস্ত সেতু নির্মাণের প্রস্তাবও এই যুক্তি থেকেই এসেছে।
পানির পথ সংকুচিত করে রেখে বড় পাম্প বসানো কোনো কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না।
খালকে আবার নদীর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে
ঢাকার খালগুলোকে বিচ্ছিন্ন জলাধার হিসেবে দেখলে হবে না।
পূর্বাঞ্চলের জামির খাল ও নারাই খালের মতো বড় প্রবাহপথকে সরাসরি বালু নদীর সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে।
একইভাবে শহরের পানি নদীতে পৌঁছানোর পথ বাধামুক্ত রাখতে হবে।
বন্যার পানি কোথাও নিয়ন্ত্রিতভাবে প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়তে দিলে নদীর নিম্নাংশে পানির চাপ কমতে পারে।
অর্থাৎ সব পানি দেয়াল তুলে আটকে রাখা কিংবা পাম্প দিয়ে দূরে সরিয়ে দেওয়ার চিন্তার বাইরে যেতে হবে।
নগর অবকাঠামোকেও অনেক ক্ষেত্রে পানির সঙ্গে সহাবস্থান করার মতোভাবে নির্মাণ করতে হবে।
জলাধার ছোট হলে পাম্পও ব্যর্থ হবে
ঢাকায় বৃষ্টির সময় সাময়িকভাবে পানি ধরে রাখার জন্য বড় জলাধার অত্যন্ত প্রয়োজন।
কল্যাণপুরের পানি ধারণ এলাকা এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
২০১০ সালে এর আয়তন ছিল ৯২ হেক্টর। ২০২৪ সালে তা কমে মাত্র ৪২ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে।
অর্থাৎ শহর যখন আরও বেশি বৃষ্টির পানি তৈরি করছে, তখন সেই পানি ধরে রাখার জায়গা উল্টো ছোট হয়ে যাচ্ছে।
কল্যাণপুর জলাধারকে আগের আয়তনে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নতুন পানি ধারণ এলাকা তৈরি করতে হবে এমন জায়গায়, যেখানে ভূমির স্বাভাবিক ঢালের কারণে এমনিতেই বেশি পানি জমা হয়।
শহরের হ্রদগুলোকে শুধু সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে দেখলে চলবে না
হাতিরঝিল, বনানী-গুলশান হ্রদ এবং ধানমন্ডি হ্রদের মতো জলাশয়গুলো ঢাকার পানি ব্যবস্থার অংশ হওয়া উচিত।
এসব জলাশয়কে বিচ্ছিন্ন সৌন্দর্যবর্ধন প্রকল্প হিসেবে না দেখে আশপাশের পানি জমার অঞ্চল এবং নদীর সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।
শহরের হ্রদ, খাল, জলাভূমি এবং নদী যদি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে একটি বড় বৃষ্টির সময় পানি ধাপে ধাপে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে।
নতুন আবাসন এলাকায় পানি নিজের এলাকাতেই ধরে রাখতে হবে
ভবিষ্যতের নগরায়ণে এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যাতে একটি নতুন আবাসন প্রকল্প তার তৈরি করা অতিরিক্ত পানি সরাসরি পাশের এলাকায় ঠেলে না দেয়।
নতুন এলাকায় খোলা মাটি, পানি ধারণ পুকুর, সাময়িক জলাধার, বৃষ্টির পানি মাটিতে প্রবেশের ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত সবুজ জায়গা রাখতে হবে।
অর্থাৎ উন্নয়ন প্রকল্পের একটি মৌলিক নীতি হওয়া উচিত—নিজের উন্নয়নের কারণে অন্য এলাকার জলাবদ্ধতা বাড়ানো যাবে না।
নালার আকার নতুন বাস্তবতা অনুযায়ী বাড়াতে হবে
ঢাকার অনেক নালা এমন সময়ের হিসাব অনুযায়ী নির্মিত হয়েছিল, যখন শহরের বড় অংশ খোলা ছিল।
এখন একই নালাকে কয়েক গুণ বেশি পানি বহন করতে হচ্ছে।
তাই শুধু নালা পরিষ্কার করলেই হবে না। কোথায় কত পানি তৈরি হচ্ছে, সেটির হিসাব করে নালার আকারও বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে বালু, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর প্রবাহ ঠিক রাখা জরুরি। কারণ শহরের পানি শেষ পর্যন্ত এসব নদীতেই যেতে হবে।
নদী যদি পলি, দখল কিংবা অন্য বাধায় তার ধারণ ও পরিবহন ক্ষমতা হারায়, তাহলে শহরের নালা পরিষ্কার থাকলেও পানি বের হতে দেরি হবে।
আবর্জনার সমস্যা কোনো ছোট বিষয় নয়
ঢাকার নালা ও খালে অবৈধভাবে আবর্জনা ফেলা পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
অনেক সময় একটি বড় নালার মুখ প্লাস্টিক, ময়লা এবং কঠিন বর্জ্যে আটকে গেলেই আশপাশের এলাকায় পানি জমতে শুরু করে।
এটি শুধু পরিচ্ছন্নতার সমস্যা নয়; এটি নগর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশ।
বিদ্যমান আইন ও জরিমানার কার্যকর প্রয়োগ ছাড়া এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
শুধু বড় প্রকল্প নয়, ছোট ছোট সবুজ ব্যবস্থাও দরকার
বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বৃষ্টির পানি নিয়ন্ত্রণে ছোট ছোট প্রকৃতিনির্ভর ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।
ঢাকায় পানি ধারণ পুকুর, জলাধার, বৃষ্টিবাগান, ছাদের বাগান, সড়কের বিভাজকে পানি শোষণকারী সবুজ অঞ্চল এবং স্থানীয় পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা বাড়ানো যেতে পারে।
এর উদ্দেশ্য খুব সহজ—বৃষ্টির সব পানি যেন একসঙ্গে নালায় না নামে।
যত বেশি পানি তার উৎপত্তিস্থলের কাছেই ধরে রাখা যাবে কিংবা মাটিতে প্রবেশ করানো যাবে, তত কম চাপ পড়বে মূল নালা ও খালের ওপর।
সবচেয়ে বড় সমস্যা দায়িত্বের বিভাজন
ঢাকার পানি ব্যবস্থাপনার অন্যতম জটিলতা হলো, পুরো ব্যবস্থার দায়িত্ব একটি সংস্থার হাতে নেই।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড—বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নালা, খাল, নদী, সড়ক কিংবা পানি নিষ্কাশনের বিভিন্ন অংশের দায়িত্বে রয়েছে।
ফলে একটি খালের এক অংশ পরিষ্কার হলেও অন্য অংশ বন্ধ থাকতে পারে। একটি সংস্থা রাস্তা নির্মাণ করতে পারে, অন্য সংস্থা পরে সেখানে নালা তৈরির চেষ্টা করতে পারে। কোথাও আবার খাল রক্ষার দায়িত্ব এক প্রতিষ্ঠানের, কিন্তু আশপাশের ভূমি ব্যবহারের অনুমোদন অন্য প্রতিষ্ঠানের হাতে।
এ ধরনের বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থাপনায় একটি নদী-খাল-নালা নির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থা সচল রাখা কঠিন।
এ কারণেই ঢাকার প্রাকৃতিক ও নির্মিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিচালনার জন্য একটি সমন্বিত কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বৃষ্টি কেবল সংকটটি প্রকাশ করে
ঢাকায় ভারী বৃষ্টি অবশ্যই জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ায়। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে আরও বেশি বৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
কিন্তু বৃষ্টি নিজে ঢাকার মূল সমস্যা নয়।
বৃষ্টি বরং শহরের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলোকে দৃশ্যমান করে।
যেখানে ৯০ শতাংশের বেশি ভূমি পানি শোষণ করতে পারে না, যেখানে ১৯৮০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নির্মিত এলাকা সাত গুণ হয়েছে, যেখানে ৬০ শতাংশ জলাভূমি ও জলাশয় হারিয়ে গেছে, যেখানে মাত্র ৩৮ শতাংশ এলাকা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নালার আওতায়, সেখানে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে পানি জমা হওয়া বিস্ময়কর নয়।
আর যখন একটি ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে মাত্র ১০ শতাংশ বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন নালা কার্যকর থাকার কথা বলা হয়, তখন সমস্যার গভীরতা আরও পরিষ্কার হয়।
তাই ঢাকার জলাবদ্ধতাকে শুধু বর্ষার সমস্যা হিসেবে দেখলে সমাধান মিলবে না।
- এটি ভূমি ব্যবস্থাপনার সমস্যা।
- এটি নগর পরিকল্পনার সমস্যা।
- এটি খাল ও জলাভূমি রক্ষার সমস্যা।
- এটি সড়ক নির্মাণের সমস্যা।
- এটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা।
এবং সবচেয়ে বড় কথা, এটি পানি কোন পথে চলবে—এই সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মকে নগর পরিকল্পনায় যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ার ফল।
ঢাকাকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে হলে তাই নতুন করে পানির পথ বুঝতে হবে। কোথায় বৃষ্টি হচ্ছে, কোথা থেকে কত পানি তৈরি হচ্ছে, পানি কোন দিকে যেতে চায়, কোথায় সেটি আটকে যাচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত কোন নদীতে গিয়ে পড়বে—পুরো ব্যবস্থাটিকে একটি ধারাবাহিক প্রবাহ হিসেবে দেখতে হবে।
খাল উদ্ধার করতে হবে, কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী সেগুলোকে প্রশস্ত ও গভীরও করতে হবে। জলাধার ফিরিয়ে আনতে হবে। নালা বাড়াতে হবে। পানির স্বাভাবিক পথে থাকা সড়কে প্রয়োজনীয় সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ করতে হবে। হ্রদ, খাল ও নদীর সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে। নতুন আবাসন এলাকায় বৃষ্টির পানি ধরে রাখার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা করতে হবে। নদীর প্রবাহ সচল রাখতে হবে। আর এসব কাজকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে নয়, একই পানি ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিচালনা করতে হবে।
শুধু সরকারও এই সংকট একা সমাধান করতে পারবে না।
নাগরিকদের নালা ও খালে আবর্জনা না ফেলা, জলাশয় দখলের বিরুদ্ধে সামাজিক অবস্থান তৈরি করা এবং খোলা ও সবুজ জায়গা রক্ষায় সচেতন হওয়া প্রয়োজন। নাগরিক সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষজ্ঞ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন কঠিন।
ঢাকার জলাবদ্ধতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এটিই—শহর যতই আধুনিক হোক, পানি তার নিজের পথ খুঁজবে।
সেই পথ যদি পরিকল্পিতভাবে খোলা রাখা হয়, বৃষ্টি শহরের জন্য দুর্যোগ হয়ে উঠবে না।
আর যদি খাল ভরাট করা হয়, জলাভূমি হারিয়ে যায়, মাটি কংক্রিটে ঢেকে ফেলা হয় এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহের ওপর রাস্তা ও ভবন দাঁড় করানো হয়, তাহলে ৭০ মিলিমিটার বৃষ্টিও একটি কোটি মানুষের শহরকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অচল করে দিতে পারে।
তাই ঢাকার প্রশ্নটি আসলে কত বৃষ্টি হলো—সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো, বৃষ্টির পানি যাওয়ার জায়গা কোথায়?

